সহস্রমাল্যের কথা
নরসুন্দর বস্ত্রবণিক পর্ব
বহুকাল পূর্বের কথা। ভারতবর্ষের কৌশাম্বি নগরে সহস্রমাল্য নামে এক তস্কর বাস করিত। চুরি করিয়াই সে জীবন ধারণ করিত আর গৃহে বৃদ্ধা জননীর দেখাশোনা করিত। এক রাত্রে সহস্রমাল্য চুরি করিতে বাহির হইল। এদিক ওদিক চাহিয়া, কাউকে না দেখিতে পাইয়া সে এক স্বর্ণকারের দোকানের ছাদে উঠিয়া বসিল। কিন্তু সহস্রমাল্য জানিত না, সেইদিন দোকানে স্বর্ণকারের ছেলে ঘুমাইয়া ছিল। সহস্রমাল্য অতি সন্তর্পণে ছাদে গর্ত করিতে লাগিল। কিন্তু সে গর্ত করিবার শব্দেই সেই স্বর্ণকারের ছেলে জাগিয়া গেল। উঠিয়া দেখিল, ছাদে একখানা গর্ত এবং তা হইতে কার একখানা পা ঝুলিতেছে। তড়িৎগতিতে সে লাফ দিয়া পা খানা চাপিয়া ধরিল, বলিল, "ধরিয়াছি!" সহস্রমাল্য এমনিতেই ঝুলিতেছিল, তদুপরি পায়ে টান খাইয়া সে ব্যথায় চিৎকার করিতে লাগিল। স্বর্ণকার পুত্রের করুণা হইল, সে সহস্রমাল্যকে ছাড়িয়া দিল। ভাবিল, চোর মহাশয় বেশ ভয় পাইয়াছে, এই কয়দিনে হয়ত আর চুরি করিবে না।
এইদিকে সহস্রমাল্য প্রকৃতই বেশ ভয় পাইয়াছিল। পা ছাড়া পাইয়াই সে উর্ধ্বশ্বাসে দৌড়পূর্বক বাড়িতে প্রত্যাবর্তন করিল। ভয়ে কাঁপিতে কাঁপিতে মাকে বলিল, "মাতঃ! ..আজ আমাকে ধরিয়া ফেলিয়াছিল! কিন্তু.. কিন্তু আবার ছাড়িয়াও দিল! সেই লোক যদি প্রহরী ডাকিয়া আমাকে ধরাইয়া দিত, আমি এতক্ষনে কারাগারে থাকিতাম!" জননী বলিলেন, "সবই ভাগ্য বৎস! কিন্তু তুমি ভয় পাইয়ো না, এই পেশায় তোমাকে ভয় পাইলে চলিবে না। .. যাক ভালই হইল। এখন হইতে তুমি আরও ধীর স্থির মস্তিষ্কে চিন্তা ভাবনা করিয়া অগ্রসর হইবে, তবেই সাফল্য লাভ করিবে। আমি জানি, তুমিই পারিবে।" বলাই বাহুল্য, সহস্রমাল্যের এই চৌর্য্যবৃত্তিতে তাহার জননী ছিলেন একমাত্র অনুপ্রেরণাদাত্রী।
মাতৃদেবীর কথায় আপ্লুত হইয়া সহস্রমাল্য অনেক ভাবিল। আর একদিন প্রত্যুষে, আগে হইতে ধার করা জমকালো পোশাক পরিধান করিয়া সে শহরের এক নামী নরসুন্দরের দোকানের সামনে দিয়া বেশ গুরুগম্ভীর ভাব নিয়া হাঁটিতে লাগিল। নরসুন্দর তাহাকে দেখিল, ভাবিল, 'উচ্চবংশীয় হইবেন বোধকরি..' আর বলিল, "মহাশয় কি ক্ষৌরকার্যসাধন অভিপ্রায়ে আসিয়াছেন? এইদিকে আসুন.."। সহস্রমাল্য দোকানে ঢুকিল, আসনে উপবিষ্ট হইয়া বলিল, "ক্ষৌর.." অনেক সময় নিয়া নরসুন্দর তাহার ক্ষৌরকর্ম সম্পন্ন করিল। নরসুন্দর ভাবিল, অনেক নিপুণ কাজ করিয়াছি। সহস্রমাল্য উঠিয়া দাঁড়াইলো, কহিল, " তোমার হাতের কাজ চমৎকার। আমি অনেক খুশি হইয়াছি। আমি তোমাকে পুরস্কৃত করিব। তোমার ছেলেটিকে আমার সহিত প্রেরণ কর, তাহার হাতেই আমি পুরস্কার দিব।" নরসুন্দর করজোড়ে গদগদ কন্ঠে কহিল, "মহাশয়ের অনেক দয়া.."।
সহস্রমাল্য দোকান হইতে বাহির হইয়া নরসুন্দরপুত্রকে সাথে করিয়া হাঁটিতে লাগিল। হাঁটিতে হাঁটিতে সে এক বস্ত্রবিপণীর সম্মুখে উপস্থিত হইল। দোকানীকে বলিল, "আমি কিছু পরিধানের বস্ত্র কিনিতে চাই, সবচাইতে উৎকৃষ্ট কিছু.. দেখিতে পারি কি?" বণিক শশব্যস্ত হইয়া পথ করিয়া দিতে দিতে সহস্রমাল্যকে নিয়া ভিতরে প্রবেশ করিল। নরসুন্দর পুত্র কোনদিন এত সুন্দর বিপণীতে আসে নাই, অবাক হইয়া এদিক ওদিক ঘুরিতে লাগিল। তস্কর সহস্রমাল্য বাছিয়া বাছিয়া সবচাইতে সুন্দর আর দামী বস্ত্রগুলা পৃথক করিল আর বলিল, "এইগুলা বাঁধাই করিয়া দিন। কিন্তু একটা কথা.. আমি সঙ্গে অর্থ নিয়া আসি নাই.. যদি কিছু মনে না করেন.. অতি নিকটেই আমার বাটী ।" তারপর সে অনতিদূরে নরসুন্দরপুত্রকে দেখাইয়া কহিল, " আপনি যদি আমার পুত্রটিকে দেখিয়া রাখেন তা হইলে আমি বাটী হইতে অর্থ নিয়া আসিতে পারি।" বণিক ভাবিল মন্দ কি, কহিল, "বেশ!" সহস্রমাল্য বালককে বলিল, "এইখানে অপেক্ষা কর, আমি আসিতেছি"। বণিক কহিল, "আপনি চিন্তা করিবেন না, আমি লক্ষ্য রাখিব।"
সহস্যমাল্য উৎফুল্ল চিত্তে বিপণী হইতে বাহির হইয়া সোজা বাটীতে প্রত্যাবর্তন করিল। সকল দামী বস্ত্র জননীকে দিয়া কহিল, "মাতঃ, সকলই আপনার জন্য।" জননী অতীব প্রীত হইলেন, কহিলেন, "দারুণ বৎস! দেখিলে তো? কিভাবে ধীর স্থির মাথায় বুদ্ধি করিয়া তুমি সফল হইলে? মনে সর্বদা আত্মবিশ্বাস রাখিবে, তবেই সকল কার্যে সফল হইবে।" সহস্রমাল্য জননীকে কহিল, "মাতঃ, কাল প্রত্যুষে আপনি নগরে যাইবেন আর এই জানিবেন, সকলে এই চুরি নিয়া কি বলে.." জননী কহিল, "অবশ্যই!"
এইদিকে সেই বিপণীতে বণিক ততক্ষনে ভাবিতে শুরু করিয়াছে- মহাশয় গেলেন, এখনো আসিলেন না.. কি হইল.. ভুলিয়াই গেলেন.. না কি.. । সে বালকটিকে বলিল, "আমাকে তোমার পিতার নিকট লইয়া চল।" অতঃপর দুইজনে বাহির হইয়া পড়িল। বালক বস্ত্রবণিককে লইয়া তাহার নরসুন্দর পিতার নিকট উপস্থিত হইল, বলিল, "এই যে, আমার পিতা.." বণিক তো নরসুন্দরকে দেখিয়া চক্ষু কপালে তুলিয়া বলিল, "কি বলিতেছ? ইনি তো তোমার পিতা নহেন! ইনি তোমার পিতা হইবেন কেন?" ততক্ষনে নরসুন্দর তাহার পুত্রকে আগুন্তুকের সহিত দেখিয়া কাছে আসিয়াছে, আগুন্তুকের কথা শুনিয়া সে বিষম রাগিয়া গেল। কহিল, "আপনার স্পর্ধা তো কম নহে! অবশ্যই আমি উহার পিতা!" তারপর পুত্রকে জিজ্ঞাসা করিলেন, "পুত্র, কে এই আগুন্তুক? আর তুমি যে সেই যুবকের সহিত পুরস্কার আনিতে গেলে তাহাই বা কই?" বণিক তখন কহিল, "কোন যুবক!" তারপর তাহাদের দুইয়ে দুইয়ে চার করিতে বেশী সময় লাগিল না। উভয়েই বুঝিল তাহারা উত্তমরূপে ঠকিয়াছে। ক্ষুব্ধ হইয়া তাহারা রাজার নিকট নালিশ করিতে চলিল।
রাজা সব শুনিলেন, বেশ চিন্তিত হইলেন। নরসুন্দর আর বণিক করজোড়ে কহিল, "মহারাজ, দয়া করুন, ইহার একটা বিহিত করুন!" তক্ষনে সভায় এক অশ্ববণিক উপস্থিত ছিল। সে কহিল, "মহারাজ, একজন তস্করের আজ হোক বা কাল, শীঘ্রই তাহার অশ্বের দরকার হইবে। আমি দেখিয়াছি, আমি জানি। তাহার এখন অর্থ হইয়াছে, সে যদি সত্যই অশ্ব কিনিবার অভিপ্রায়ে আমার নিকট আসে, আমি নিশ্চয়ই তাহাকে ধরিব!" খবর ছড়াইয়া পড়িল সেই সন্ধ্যায় রাজার প্রধান নর্তকীও আসিয়া কহিল, "মহারাজ, এই তস্করের কিছুদিন হয় টাকা হইয়াছে। সে নিশ্চয়ই তা উড়াইতে আমার বাটীতে আসিবে। যদি সত্যই আসে, আমি তাহাকে ধরিব আর আপনার নিকট সমর্পণ করিব।" চারিদিকে দ্রুত খবর ছড়াইয়া পড়িল, সবাই জানিল রাজ্যে এক চতুর তস্করের আবির্ভাব হইয়াছে, এক অশ্ববণিক আর নর্তকী রাজাকে সাহায্য করিবেন বলিয়া প্রতিশ্রুতি দিয়াছেন। সহস্রমাল্যের জননীও সব শুনিলেন। বৃদ্ধা আসিয়া সবকিছু সহস্রমাল্যের নিকট খুলিয়া বলিলেন, কহিলেন, "বুঝিলে তো! তোমাকে আরো সাবধান হইতে হইবে।" সহস্রমাল্য স্মিত হাসিয়া কহিল, "মাতঃ, চিন্তা করিবেন না। ইহাদের সহিত যখন শেষ করিব, ইহারা কপাল চাপড়াইয়া দুঃখ করিবে, কহিবে- কেন উহার পথ মাড়াইতে গেলাম.."
নর্তকী অশ্ববণিক পর্ব
সেইদিন সন্ধ্যায় রাজসভার সেই অশ্ববণিক যখন নগর হইতে অনতিদূরে আপন তাম্বুতলে বিশ্রাম লইতেছিল, দেখিল, দূর হইতে কে যেন এদিকেই আসিতেছে। ক্রমে সেই ব্যক্তি আরো নিকটে আসিলে সে বুঝিল, ভদ্রলোক কোন উচ্চবংশীয় ধনী হইবেন। হায়.. যদি সে বুঝিত.. এ ছিল সেই তস্কর সহস্রমাল্য!
সহস্রমাল্য অশ্ববণিকের সম্মুখে আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, "ভদ্রে, কে আপনি? এইখানে তাম্বু গাড়িয়াছেন কেন?" বণিক কহিল, "মহাশয় আমি এক অশ্ববণিক, আমি আপনাদের দেশে নতুন, বাণিজ্য করিতে আসিয়াছি।" সহস্রমাল্য কহিল, "তাই নাকি! পরিচিত হইয়া বেশ প্রীত হইলাম.." কিয়ৎক্ষন থামিয়া আবার কহিল, "তো মহাশয় আপনি আমার সহিত চলেন না কেন? আপনি বণিক, কত দেশ ঘুরিয়াছেন! অতি নিকটেই আমার বাটী, আপনার ন্যায় সজ্জন অতিথি আমার গৃহে আসিলে বেশ আনন্দিতই হইব। আপনার সহিত গল্প করাও হইবে, আমার নারায়ণ সেবাও হইবে.." সহস্রমাল্যের কথায় বণিক বেশ গলিয়া গেল, কপট বাঁধা দিয়া বলিল, "না না সে কি! আপনি আবার কেন কষ্ট করিবেন!" সহস্রমাল্য বলিল, "না মহাশয়, আপনার ন্যায় বিদেশীকে আমি এইরূপ স্থলে রাত্রিবাস করিতে দিতে পারি না। আপনি আর না করিবেন না।" বণিক দন্ত বিকশিত করিয়া কহিল, "বেশতো.. এত করিয়া যখন বলিতেছেন, না করি কিরূপে! আমাকে কিয়ৎক্ষন সময় দিন, অশ্বগুলা রথে বাঁধিয়া লই তবে!" সবকিছু ঠিক হইলে দুইজনে রথে চড়িয়া বসিল। রাত্রি হইবার আগেই তাহারা এক প্রাসাদসম গৃহে উপস্থিত হইল।
ইহা ছিল রাজার সেই প্রধান নর্তকীর গৃহ, তার প্রমোদালয়। নর্তকী দূর হইতে যখন তাহাদের দেখিল, ভাবিল, আহ! দুইজন ধনী লোক! মা লক্ষ্মী মনে হয় স্বয়ং তাহাদের এই পথে পাঠাইয়াছেন! নর্তকী এর আগে আর বণিককে দেখে নাই, সহস্রমাল্যকেও না। উহাদের আসিলে সে স্বয়ং ছুটিয়া করজোড়ে সম্ভাষণ জ্ঞাপন পূর্বক তাহাদের বরণ করিল। সহস্রমাল্য নর্তকীকে দেখিয়াই দ্রুত আগাইয়া আসিল আর তাহাকে একটু আড়ালে নিয়া কহিল, "বুঝিলে, আমার বন্ধুখানি ধনী আর সহৃদয়। তিনি তোমার নৃত্য দেখিবার অভিপ্রায়ে এইখানে আসিয়াছেন। কিন্তু.."
"উনি আগে পরিষ্কার হইয়া বিশ্রাম করিতে চাহেন, এইতো? চিন্তা নাই, আমি তাহাকে আমার সবচাইতে উত্তম ঘরখানাই দিব" নর্তকী কহিল।
তারপর তাহারা আবার বণিকের নিকট আসিলে নর্তকী বণিককে কহিল, "ভদ্রে, দয়া করিয়া আমাকে অনুসরণ করুন।" বণিক গদগদ চিত্তে তাহার পিছন পিছন গেল। নর্তকী তাহাকে তার ঘর দেখাইয়া পুনরায় সহস্রমাল্যের নিকট ফিরিয়া আসিল, বলিল, "আর মহাশয়, আপনার জন্য?.." সহস্রমাল্য খুবই ব্যস্ত মত ভাব করিল, কহিল, "এক্ষনে নয়, আমি এখন চলিয়া যাইব, মহারাজের সহিত দেখা করিতে হইবে.. তিনি আমাকে এক গুরুত্বপূর্ণ কার্যের নিমিত্তে ডাকিয়াছেন.." বলিয়া থামিল সহস্রমাল্য, হঠাৎ নিজের দেহে চোখ বুলাইতে বুলাইতে কহিল, "ওহ ঈশ্বর! কি ভুল.. কি ভুল.. বেশী ত্বরা করিতে গিয়া আমি আমার অলংকার পড়িতেই ভুলিয়া গিয়াছি! ওহ হো! .. এখন এইরূপে কি করিয়া আমি রাজার সম্মুখে যাই.. বাটীতে যে যাইব আরো দেরী হইয়া যাইবে.." থামিয়া কহিল, " যদি কিছু মনে না কর.. তুমি কি.. কিভাবে বলি.. তুমি কি কিছু অলংকার ধার দিয়া আমাকে সাহায্য করিতে পার?" নর্তকী কহিল, "কেন নয়? আপনার মত কাউকে সাহায্য করিতে পারিলে নিজেকে ভাগ্যবতীই বোধ করিব। আমার সাথে চলুন, পছন্দমত অলংকার বাছিয়া লউন।" অতঃপর সহস্রমাল্য নর্তকীর সহিত তার রত্নভান্ডারে প্রবেশ করিল, ইচ্ছামত যত দামী অলংকার আর রত্নে নিজেকে ভূষিত করিয়া কহিল, "বেশ উপকার করিলে, হয়ত কিছুই নয়, তবু আমি এই উপকারের কথা ভুলিব না।" নর্তকী কহিল, "দয়া করুন, আর লজ্জ্বা দিবেন না।" সহস্রমাল্য কহিল, "যাইবার পূর্বে একবার বন্ধুর সহিত দেখা করিয়া আসি, দেখি তার কোন অসুবিধা হইতেছে কিনা।"
ওইদিকে বণিক তখন এত সুন্দর ঘর, রাজসিক আতিথেয়তা পাইয়া বেশ চমৎকৃত হইয়াছিল। সহস্রমাল্য ঘরে ঢুকিলেই সে উঠিয়া দাঁড়াইল, আর আহলাদে গদগদ হইয়া কহিল, "মহাশয়, আপনি আমার জন্য এতকিছু করিতেছেন!.. কি বলিয়া যে আপনাকে ধন্যবাদ দেই.." সহস্রমাল্য হাসিয়া উড়াইয়া দিল, কহিল, "আহ! এ কিছুই নয়! আপনি বিশ্রাম করুন, আমি ফিরিয়া আসা পর্যন্ত আমার স্ত্রী আপনার দেখাশোনা করিবে। কিন্তু কিছু যদি মনে না করেন, একখানা ব্যাপারে আমার আপনার সাহায্যের প্রয়োজন।"
"বিলক্ষণ! বিলক্ষণ!" বলিল বণিক। সহস্রমাল্য তখন কহিল, "রাজার সহিত দেখা করিব, প্রাসাদে যাইব! কিন্তু আমার অশ্বগুলার কোনটাই অত দ্রুতগামী নয়, তাই আপনি যদি আপনার কোন দ্রুতগামী অশ্ব ধার দিতেন.." বণিক কহিল, "মহাশয় এত সঙ্কোচ করিতেছেন কেন? আপনি আমার একখানা অশ্ব নিয়া যান, উহারা যথেষ্ঠ দ্রুতগতি সম্পন্ন। আপনি যা করিলেন তার বিনিময়ে এই ক্ষুদ্র উপকারটুকু করিতে পারিলে নিজেকে ধন্যই মনে করিব!" সহস্রমাল্য বেশ আনন্দিত ভাব করিল, আর সেই দ্রুতগামী অশ্বে চাপিয়া অতি দ্রুতই সে চলিয়া গেল। এইভাবে সেই বণিক আর নর্তকী, যাহারা সহস্রমাল্যকে ধরিবে বলিয়াছিল, সহস্রমাল্য তাহাদেরই ধরিয়া উত্তমরূপে নিঙড়াইয়া ছাড়িয়া দিল। বাটীতে ফিরিয়া সে জননীর নিকট অশ্ব আর অলংকার দিয়া কহিল, "খুব প্রত্যুষেই.." .. "নগরে যাইতে হইবে তো? জানি!" বলিল জননী।
এইদিকে সেই নর্তকী আর অশ্ববণিকও বুঝিতে পারিয়াছিল যে তাহারা ঠকিয়াছে। হা হুতাশ শেষে তাহারা একমত হইল, এ নিশ্চয়ই সেই তস্কর, যাহাকে ধরিবে বলিয়া তাহারা ভাবিয়াছিল। অতঃপর তাহারা রাজার নিকট গেল। আদ্যোপান্তঃ সবিস্তারে কহিলে রাজা এইবার বেশ ক্রুদ্ধ হইলেন। ততক্ষণাৎ তিনি তাহার প্রধান প্রহরীকে ডাকিয়া পাঠাইলেন, কহিলেন, "এই তস্কর দিন দিন বড়ই শক্তিশালী হইয়া উঠিতেছে! পাঁচদিন সময় দিলাম, এর ভিতরেই তুমি তাহাকে ধরিবে!" কুর্নিশ করিয়া প্রহরী কহিল, "চিন্তা করিবেন না মহারাজ! এই দুষ্টকে আমিই ধরিব! দেখিব সে এইবার কি করিয়া ফাঁকি দেয়!" পরদিন সকালে জননীর মুখে সবই শুনিল সহস্রমাল্য। জননী কহিল, "খুবই সাবধান বৎস! এইবার প্রহরীপ্রধান তোমার পিছনে লাগিয়াছে! খুবই সাবধান!" সহস্রমাল্য হাসিল, কহিল, " এইবার তবে প্রহরীপ্রধান? বেশ! .."
প্রহরীপ্রধান মহারাজ পর্ব
সেইদিন সন্ধ্যায় সহস্রমাল্য একজন সভ্য ভদ্র নাগরিকের বেশে নগরীর জুয়াখেলার স্থলে গিয়া উপস্থিত হইল। সে জানিয়া নিয়াছিল প্রহরীপ্রধান মহাশয় পাশার জুয়া খেলিতে পছন্দ করিত। কিয়ৎক্ষণ ঘুরিবার পরেই সে দেখিতে পাইল সেই প্রহরীপ্রধানকে। অনেকক্ষণ নিকটে দাঁড়াইয়া খেলা দেখিতেছিল সহস্রমাল্য। একসময় সে প্রহরীপ্রধানকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিল, "সবাই বলে, আপনি নাকি বেশ পাশা খেলেন। তো একদান চলিবে নাকি?" প্রহরীপ্রধান আগুন্তুককে আগে দেখে নাই, কহিল, "নিশ্চয়ই খেলিব, কিন্তু একটা কথা.. আমার সহিত খেলিতে হইলে কিন্তু বেশ বড় রকমের পণ করিতে হইবে!" সহস্রমাল্য হাসিয়া কহিল, "বেশ তো.." এইখানে একটা কথা বলিয়া নিতে হয়, সহস্রমাল্য বেশ ভালই পাশা খেলিতে জানিত।
এক দুই চাল জিতিবার পর সহস্রমাল্য বুঝিল সবকিছু তার বুদ্ধি মতই চলিতেছে। এইভাবে যখন আস্তে আস্তে প্রহরী মহাশয় কপর্দকশূন্য হইল, যখন তাহার আর খেলিবার কিছু বাকী রহিল না, সে বলিয়া উঠিল, "আপনার ভাগ্য বেশ ভালই বলিতে হইবে। কিন্তু আমি এখনও আশা ছাড়ি নাই, আমার এই অঙ্গুরীয় পণ করিলাম, আরেক দান খেলা যাক!" সহস্রমাল্য বলিল, "যেমন আপনার ইচ্ছা।" মনে মনে ভাবিল, "ইহাই তো চাহিতেছিলাম!" প্রহরীপ্রধান সেই অঙ্গুরীয়খানিও হারিলেন। সবাই উঠিয়া যাইবেন, এমন সময় এক রাজদূত আসিয়া প্রহরীপ্রধানকে বলিল যে মহারাজা কিনা তাহাকে দেখা করিতে বলিয়াছেন। সহস্রমাল্যের চোখ আনন্দে নাচিয়া উঠিল। প্রহরী মশাই চলিয়া গেলে সে ভাবিল, ভাগ্য আমার বেশ ভালই বলিতে হইবে!
জুয়ার স্থল হইতে বাহির হইয়াই সহস্রমাল্য দ্রুত প্রধান মশাইয়ের বাটীতে গিয়া উপস্থিত হইল আর তার স্ত্রীর সহিত দেখা করিল, বলিল, "দেবী, এক ভয়ানক ব্যাপার ঘটিয়াছে, আপনাদের বড় বিপদ! আপনার স্বামীকে বন্দী করা হইয়াছে!" শুনিয়া তো প্রহরীপ্রধানের স্ত্রী চক্ষু কপালে তুলিল, বলিল, "কি বলিতেছেন? আমার স্বামী কি করিয়াছে? তিনি নিজেই তো প্রহরীপ্রধান! এইসব আপনি কি বলিতেছেন!" সহস্রমাল্য কহিল, "সবই ষড়যন্ত্র দেবী। কিন্তু এক্ষণে এইসব বলিবার সময় নাই। রাজার লোকেরা আসিতেছে, রাজা আপনাদিগের ধনসম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করিতে আদেশ দিয়াছেন। বন্দী হইবার পূর্বে আপনার স্বামী সব বুঝিতে পারিয়া আমাকে বলিয়াছিলেন আমি যেন আপনাদের মূল্যবান ধনসম্পদ সরাইয়া কোন নিরাপদ জায়গায় লুকাইয়া রাখি। মনে হয় তাহার এই অঙ্গুরীয় দেখিলে আপনি সব বিশ্বাস করিবেন.. " সহস্রমাল্য সেই অঙ্গুরীয়খানি দেখাইল। প্রহরীর স্ত্রী তখনও কিছু বিশ্বাস করিতে পারিতেছিল না, কিন্তু অঙ্গুরীয় দেখিবা মাত্র সে চমকিয়া কহিয়া উঠিল, "হায় ঈশ্বর একি হইল! শীঘ্র ভিতরে আসুন" তারপর দ্বার বন্ধ করিয়া বলিল, "কিভাবে কি করিব, আমি তো কিছুই বুঝিতেছি না!" সহস্রমাল্য কহিল, "এত অস্থির হইবেন না, শান্ত হউন। একখানি বড় থলে নিয়া আপনাদের মূল্যবান ধনরত্ন ভরিয়া আমাকে দিন।" প্রহরীর স্ত্রী তাহাই করিল, সব ভরা শেষ হইলে কহিল, "এই নিন, সাবধানে সব লইয়া যান! আপনাকে যে কি বলিয়া ধন্যবাদ দিব.." সহস্রমাল্য বলিল, "ও কিছু নয়" আর থলে কাঁধে নিয়া উধাও হইল।
বাটিতে ফিরিয়া সহস্রমাল্য তাহার মাতাকে থলে খুলিয়া রত্নাদি দিতে দিতে কহিল, "মাতঃ! প্রহরীপ্রধানের পক্ষ হইতে আপনার জন্য উপহার.. " জননী কহিল, "করিয়াছ কি! কিভাবে করিলে!" সহস্রমাল্য সব খুলিয়া কহিলে, বৃদ্ধা কহিল, "তোমার বুদ্ধি দেখিয়া চমৎকৃত হইলাম বৎস, কিন্তু এই পর্যন্তই থাক, বেশী ঝুঁকি লইয়ো না।" ওইদিকে রাজার সহিত দেখা করিয়া রাত্রিবেলায় প্রহরীপ্রধান বাটীতে আসিলে তাহার স্ত্রী দৌড়াইয়া আসিল, কহিল, "আপনি ছাড়া পাইয়াছেন? কি করিয়া পাইলেন? কেন আপনাকে বন্দী করিয়াছিল?" স্ত্রীর এহেন প্রশ্নে প্রহরী বেশ অবাক হইল, কহিল, "বন্দী করিবে? কাকে? কি বলিতছ এইসব?" স্ত্রী কহিল, "আপনার বন্ধু আসিয়াছিল, সব ধনরত্নাদি লইয়া গেল.." প্রহরী কহিল, "বন্ধু? ধন রত্ন? কি কহিতেছ, সব খুলিয়া বল।" তারপর তাহার স্ত্রী যখন তাহাকে সব খুলিয়া বলিল.. তার মুখ মৃতবৎ বর্ণহীন হইল। সে প্রথমে কিছুই কহিতে পারিল না। তাহার স্ত্রীর বারংবার প্রশ্নে সে কপালে হাত রাখিয়া বলিল, "আমরা প্রতারিত হইয়াছি.. এই ব্যক্তিই সেই কুখ্যাত তস্কর, যাহাকে ধরিতে আমি সঙ্কল্প করিয়াছিলাম।"
পরদিন প্রাতে রাজসভায় উপস্থিত হইয়া অধোবদনে প্রহরী কহিল, "মহারাজ.. সেই তস্কর আমাকেও ঠকাইয়াছে!" রাজা শুনিয়া নিজের কানকে বিশ্বাস করিতে পারিলেন না। তারপরই ভয়ানক ক্রুদ্ধ হইয়া বলিলেন, "এক্ষণে আমার চক্ষের সম্মুখ হইতে দূর হও! আমি তোমাকে চোর ধরিতে দিলাম আর তুমি কিনা তারই শিকার হইয়া ফিরিলে! যতসব মূর্খের দল! এখন তো দেখিতেছি, ব্যাপারটা আমাকেই দেখিতে হইবে! .. এই কে আছ! যাও আমার মন্ত্রীদের বার্তা পাঠাও!" চারিদিকে দ্রুত খবর ছড়াইয়া পড়িল, মহারাজা এইবার নিজেই সেই তস্করকে ধরিতে সঙ্কল্প করিয়াছেন।
সহস্রমাল্যে জননী সব শুনিয়া বেশ ভয় পাইলেন, গৃহে ফিরিয়া পুত্রকে কহিলেন, "খুবই সাবধান বৎস! খুবই সাবধান! আমাদের রাজা কিন্তু মূর্খ নহেন।" সহস্রমাল্য কহিল, "পরীক্ষা করিয়া দেখিতে দোষ কি.."
কিছুদিন পরে এক রাত্রে সহস্রমাল্য সাধারণ বেশভুষায় রাজপ্রাসাদের দ্বারে উপস্থিত হইল। রাজপ্রাসাদের রক্ষী তাহার পথ রোধ করিয়া দাঁড়াইলে সে কহিল, "আমি বেশ উত্তমরূপে গাত্র মর্দন করিতে পারি। শুনিয়াছি মহারাজা বেশ দয়ালু, যদি তাহাকে খুশি করিতে পারিতাম.." রক্ষীরা গোবেচারা সহস্রমাল্য আর তাহার পুটুলি-পাটুলি দেখিয়া সন্দেহ করিল না। রাজার কাছে খবর যাইতেই, রাজা সহস্রমাল্যকে ডাকিয়া পাঠাইলেন। অনেক পথ ঘুরিয়া সহস্রমাল্য যখন প্রাসাদের ছাদে রাজার নিকট আসিল, রাজা তখন চিন্তিত মুখে পায়চারি করিতেছিলেন। সহস্রমাল্যকে দেখিয়া তিনি বলিলেন, "তুমি যথার্থ সময়ে আসিয়াছ! এ কয়দিন সেই দুষ্ট তস্করকে খুঁজিবার নিমিত্তে নানাদিক ঘুরিয়া খবরাখবর লইতে লইতে বেশ পরিশ্রান্ত হইয়া গিয়াছি.. গাত্রের নানাস্থানে প্রদাহ অনুভব করিতেছি.." সহস্রমাল্য কহিল, "চিন্তা করিবেন না মহারাজ, আপনি শুইয়া পড়ুন, নিমিষেই আপনার সব ব্যথা দূর করিব।" রাজা তাহার মুকুট খুলিয়া, অলঙ্কারাদি খুলিয়া শুইয়া পড়িলেন। সহস্রমাল্য তার মর্দন শুরু করিল, কহিল, "..রাজা, আপনি আস্তে আস্তে চক্ষু বন্ধ করুন, শরীর ছাড়িয়া দিন .."। রাজা তাই করিলেন আর আস্তে আস্তে বেশ আরাম অনুভব করিতে লাগিলেন, এইভাবে একসময় তিনি ঘুমাইয়া পড়িলেন। বলিয়া রাখি, সহস্রমাল্য গাত্রমর্দনেও বেশ পটু ছিল।
রাজা যখন বেশ গাঢ়নিদ্রায়, সহস্রমাল্য স্মিত হাসিয়া কহিল, শুভনিদ্রা রাজন, এক্ষণ আমাকে যাইতে হইবে.. আপনি নিশ্চয়ই আমাকে ক্ষমা করিবেন যদি আমি আপনার মুকুট হইতে এই পাথর আর আপনার অলংকারাদি আমার জননীর জন্য লইয়া যাই..। সবকিছু নিয়া সহস্রমাল্য অতি সন্তর্পণে প্রাসাদ বাহিয়া পলাইয়া গেল। অনেকক্ষণ পরে রাজা উঠিলেন। গাত্রমর্দনের পর এরকম ঘুম দিয়া তিনি এমনিতেই বেশ সতেজ একটা ভাব অনুভব করিতেছিলেন, ভাবিতেছিলেন যে, নাহ লোকটার হাতে যাদু আছে বলিতে হইবে! তখনই তিনি খেয়াল করিলেন তাহার মুকুট হইতে পাথর, অলংকার কিছুই আর নাই! যখন বুঝিলেন, চিৎকার করিয়া উঠিলেন, "রক্ষী! রক্ষী!" রক্ষীরা ছুটিয়া আসিল। তিনি কহিলেন, "মূর্খ, তোমরা কি ঘুমাইতেছিলে? শীঘ্র তাহাকে খুঁজিয়া বাহির কর, এই সেই তস্কর! এই মর্দনকারীই সেই তস্কর!" রক্ষীরা শুনিয়া দলে দলে প্রাসাদে ছড়াইয়া পড়িল। কিন্তু তা করিলে কি হইবে, সহস্রমাল্য ততক্ষণে তাহার হাতের যাদু দেখাইয়া চলিয়া গিয়াছিল।
বসুধা আর সহস্রমাল্য পর্ব
রাজার মুকুটের পাথর আর অলংকারাদি থলেতে পুরিয়া রাত্রিকালীন শীতল বিশুদ্ধ বাতাস খাইতে খাইতে সহস্রমাল্য তখন আপন গৃহে ফিরিতেছিল। ক্ষণে ক্ষণেই সে আপনমনে হাসিয়া উঠিতেছিল; কিরূপে রাজাকে বোকা বানাইয়াছে সেই কথা স্মরণ করিয়া। সহস্রমাল্য বড়ই খুশি হইয়াছিল। গৃহে আসিয়া যখন সে তাহার পুটুলিখানি খুলিয়া নিঃশব্দে মাতৃদেবীর হস্তে একে একে সব পাথর রত্নাদি সমর্পণ করিতেছিল, বৃদ্ধা বলিয়া উঠিলেন, "করিয়াছ কি? এতো মহারাজের মুকুটের পাথর!" বৃদ্ধা জানিতেন তাহার পুত্র বুদ্ধিমান, কিন্তু এতটা হয়ত তিনিও ধারণা করিতা পারেন নাই। তিনি বলিলেন, "বৎস সহস্রমাল্য! তুমি সত্যই আমাকে অবাক করিলে! তোমার বুদ্ধির নিকট সবাই তুচ্ছ! যে কিনা রাজাকেই বোকা বানাইতে পারে, তাহার সম্মুখে আর কে দাঁড়াইবে?"
এত বড় প্রশংসা শুনিয়া সবারই আনন্দিত হইবার কথা। কিন্তু সহস্রমাল্য কেন জানি উৎফুল্ল হইতে পারিল না, তাহার হাসিমুখখানি কিঞ্চিৎ মলিন হইয়া গেল। সে ভাবিল, 'তাইতো.. আর কেই বা দাঁড়াইবে?'
জননী সহস্রমাল্যের মুখ দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, "কি হইয়াছে বৎস, নিশ্চুপ হইলে কি কারন?" সহস্রমাল্য কহিল, "মাতঃ.. ভাবিতেছি রাজাকেই তো হারাইয়া দিলাম.. আর এখন কাহার সহিত লড়িব? আর কোথায়ই বা চুরি করিব.. কেমন জানি উৎসাহ পাইতেছি না.. মনে হইতেছে যেন যাত্রার শেষে আসিয়া দাঁড়াইলাম.."। সহস্রমাল্য ধীরে ধীরে নিজঘরে চলিয়া গেল, জননী ভাবিলেন, 'ও কিছু নয়! নিশ্চয়ই প্রাতে ঠিক হইয়া যাবে।'
জননী ঠিকই ভাবিয়াছিলেন। কয়দিন পরই সহস্রমাল্য আবারও তাহার শিকার ধরিতে বাহির হইল। সেইদিন সহস্রমাল্য ঘুরিতে ঘুরিতে এক জায়গায় আসিয়া দেখিল সেইখানে বহু লোকের সমাগম ঘটিয়াছে। সে ভাবিল, "ভাগ্য সুপ্রসন্ন বলিতে হইবে! এতগুলা লোক একসাথে এক জায়গায় দাঁড়াইয়া আছে। যাই গিয়া দেখি কাহারা কতটা ধনী, তাহাদের গৃহে গিয়া দেখি কি লইতে পারি!" ধীরে ধীরে যখন সহস্রমাল্য ভীড়ে মিশিতেছিল, দেখিল সবাই এক শ্বেতবস্ত্র পরিহিত মুন্ডিতমস্তক এক সন্ন্যাসীকে ঘিরিয়া দাঁড়াইয়াছে। সন্ন্যাসী বৃক্ষতলে পদ্মাসনে উপবিষ্ট হইয়া আছেন। তাহার শান্ত সৌম্য মুখখানিতে কি যেন এক দ্যুতি। সহস্রমাল্য অবাক হইল, ধনী শিকারের পরিবর্তে সেও দাঁড়াইয়া পড়িল। যদিও সে তখনও জানিত না- ঠিক কি কারনে।
অতঃপর সন্ন্যাসী মুখ খুলিলেন, তাহার বচন সহস্রমাল্যকে মুগ্ধ করিল। নিজমনেই সে স্বীকার করিল, এরূপভাবে সে কখনও আর কাউকে কথা বলিতে শুনে নাই। সন্ন্যাসী বলিতে লাগিলেন,
"..ভ্রাতঃসকল, আমরা যেন লক্ষ্য রাখি.. লক্ষ্য রাখি যেন আমাদের কোন ক্রিয়া দ্বারা অপর কেহ আহত না হয়। তোমার যেরূপ জীবনানন্দে অধিকার আছে, অন্যদেরও তেমনই আছে। কেহ যদি তোমার মূল্যবান কিছু আত্মসাৎ করে, তুমি কি আনন্দিত হইবে?"
সহস্রমাল্য মনে মনে কহিল, "কখনই নয়.."
সন্ন্যাসী কহিয়া গেলেন, "..এই কারনেই তোমারও কারো কিছু আত্মসাৎ করা উচিত নয়..."
সহস্রমাল্যের মাথায় যেন বজ্রাঘাত হইল! সে ভাবিল, 'তিনি কিভাবে এই কথা বলিলেন! চৌর্য্যবৃত্তিই আমার পেশা, আমার জননী কহিয়াছেন চুরিই আমার একমাত্র কাজ!'
সন্ন্যাসী বলিতেছিলেন, "... তোমার কখনই কারো সহিত এমন কিছু করা উচিত না, যা তুমি চাহিবে না কেহ তোমার সহিত করুক। ..তোমার কাছে যা কষ্টদায়ক, সমভাবে তা অন্যের নিকটেও কষ্টদায়ক.."
সহস্রমাল্য বিমর্ষ হইয়া পড়িল, ভাবিল, 'তবে কি আমার মাতা সারাজীবন আমাকে অসৎপথে চালিত করিয়াছেন? তিনিতো কখনও আমাকে এইরূপ কিছু বলেন নাই!.. তাহাকেও কি কেউ ভ্রান্তপথে চালিত করিয়াছিল?' একে একে সহস্রমাল্যের সব কথা মনে পড়িয়া গেল। যে সহস্রমাল্য কখনো এক কাজ করিয়া দুইবার ভাবে নাই, সে তার পূর্বের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হইতে লাগিল। তাহার মনে পড়িল সেই ক্ষৌরকারের কথা, সরলমনে পুরস্কারের নিমিত্তে যে তাহার সন্তানকে তাহার সহিত প্রেরণ করিয়াছিল, সেই বস্ত্রবণিকের কথা যাহার দোকান সে প্রায় শূন্য করিয়া ফেলিয়াছিল। সেই নর্তকীর কথা যে কিনা বিনা বাক্যব্যয়ে তাহাকে অলংকারাদি ধার দিয়াছিল, সেই অশ্ববণিক যাহাকে ব্যবহারে ভুলাইয়া সে তাহার অশ্বচুরি করিয়াছিল, প্রহরীপ্রধান, তাহার স্ত্রী, আর রাজা সবার কথাই তাহার একে একে মনে পড়িতে লাগিল। সে ভাবিল, "উহারা সকলেই আমার মতই মানুষ, তাহাদেরও আমার মতই কষ্ট আনন্দ অনুভূতি আছে। তাহারা সকলেই আমাকে বিশ্বাস করিয়াছিল। আমি তাহাদের বিশ্বাস ভঙ্গ করিয়াছি। ... সেই রাত্রে স্বর্ণকারপুত্র করুণাবশবর্তী হইয়া আমাকে ছাড়িয়া দিয়াছিল। কিন্তু আমি আমার কোন শিকারের প্রতি বিন্দুমাত্র করুণা করি নাই।"
এইভাবে সহস্রমাল্য যখন বিবেকের দংশনে জর্জরিত হইতেছিল, সেই সন্ন্যাসী তাহার বচন শেষ করিয়া চলিয়া যাইতেছিলেন। সহস্রমাল্য দেখিয়া দৌঁড়াইয়া ডাকিয়া উঠিল, "প্রভু!" ছুটিয়া আসিয়া তাহার চরণে পড়িয়া কহিল, "আমি পাপী..আমাকে উদ্ধার করুন, আমাকে আমার পথের সন্ধান দিন..." সন্ন্যাসী বলিলেন, "উঠ বৎস, কি হইয়াছে তোমার?" সহস্রমাল্য কহিল, "আপনার বচনে, প্রতিটা শব্দে আমার হৃদয় দ্রবীভূত হইয়া গেছে, কিন্তু তাহারা কি আমার পাপও সমভাবে ধুইয়া লইয়া যাইতে পারে?" সন্ন্যাসী সহস্রমাল্যের হাত ধরিয়া দাঁড় করাইলেন, কহিলেন, "কেন নয়.. তুমি যদি তোমার কৃতকর্মের জন্য সত্যই অনুতপ্ত হও, যদি সত্যই তোমার পাপ দূর করিতে চাও তবে তা সম্ভব বৈকি। তবে বৎস, যদি সত্য সত্যই তুমি সুপথের সন্ধান চাও তবে আমি যাহা বলিব তোমাকে তাহাই শুনিতে হইবে।"
আস্তে আস্তে সূর্যদেব ডুবিয়া গেলে সন্ধ্যা নামিয়া আসিল। বনপ্রান্তে শুধু দাঁড়াইয়া রহিল দুইটি মূর্তি, সহস্রমাল্য আর সন্ন্যাসী। সন্ন্যাসী সহস্রমাল্যের সব কথা শুনিলেন, তাহাকে কি করিতে হইবে সব বুঝাইয়া বলিলেন। এই সন্ন্যাসী কোন সামান্য সন্ন্যাসী ছিলেন না, ইনি ছিলেন জ্ঞানী এক সাধু। সবাই ডাকিত, পূণ্যাত্মা বসুধা।
পরদিন বসুধা এক মন্দিরের নিকটে পুনরায় বচন দিবার নিমিত্তে আসিয়াছিলেন। সেইস্থলে বেশ জনসমাগম হইয়াছিল, সবার সম্মুখে রাজাও উপবিষ্ট ছিলেন। সহস্রমাল্য দ্বারা লুন্ঠিত হওয়া অবধি তিনি লজ্জায় আহার নিদ্রা ত্যাগ করিয়াছিলেন। বচন শেষ হইলে রাজা উঠিয়া আসিলেন, কহিলেন, "সাধু, আপনি জ্ঞানশ্রেষ্ঠ, আমাকে সেই দুষ্ট তস্করটিকে খুঁজিয়া পাইতে সাহায্য করুন.." বসুধা বলিলেন, "রাজা, যদি বলি তাহাকে পাওয়া গেছে?" তারপর ভীড় হইতে অবনতমুখ সহস্রমাল্যকে সম্মুখে নিয়া আসিয়া বলিলেন, "এই সেই ব্যক্তি.. যাকে আপনি খুঁজিতেছেন" রাজা যারপরনাই বিস্মিত হইলেন, কহিলেন, "কি বলিতেছেন!" উত্তরে সাধু হাসিলেন কেবল। রাজা বুঝিলেন সাধু কখনই মিথ্যাচার করিবেন না, সম্বিৎ ফিরিয়া পাইয়া তিনি চিৎকার করিলেন, "রক্ষী! রক্ষী!" বসুধা বাদ সাধিলেন, বলিলেন, "রাজা! রক্ষীদের আর প্রয়োজন হইবে না। এই ব্যাক্তি বহু আগেই আত্মসমর্পণ করিয়াছে। সে বড়ই অনুতপ্ত। তাহার নাম সহস্রমাল্য।" সহস্রমাল্য আসিয়া রাজার পায়ে পড়িল, কহিল, "রাজন, আপনি যাহা বলিবেন তাহাই হইবে, আমি সকল শাস্তি মাথা পাতিয়া লইব।" সহস্রমাল্যর জননীও ভীড়ের মধ্যে ছিল, তাহাকে দেখাইয়া সহস্রমাল্য কহিল, "ইনি আমার মাতা, যে সকল ধন সম্পদ আমি চুরি করিয়াছি, সকলই আমরা তাহাদের অধিকর্তা-কত্রীর নিকট ফিরাইয়া দিতে নিয়া আসিয়াছি।" রাজা ততক্ষণে ক্রোধ সংবরণ করিয়া সব শুনিতেছিলেন, তিনি বলিলেন, " তুমি যখন স্বেচ্ছায় ধরা দিয়াছ.. কৃত অপরাধের জন্য অনুতপ্ত হইয়াছ আর যখন পূণ্যাত্মা বসুধা স্বয়ং তোমার জন্য বলিতেছেন, আমি তোমাকে ক্ষমা করিলাম।" সহস্রমাল্যের চক্ষু আনন্দাশ্রুতে পরিপূর্ণ হইয়া গিয়াছিল, সে করজোড়ে কহিল, "রাজা, আপনি প্রকৃতই মহান, আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ.." রাজা কহিলেন, "তোমার পরিবর্তনে আমি আনন্দ বোধ করিতেছি। তবে তোমার বুদ্ধির প্রশংসা না করিলেই নয়, তোমার বুদ্ধির কাছে আমাকেও হার মানিয়া নিতে হইয়াছিল। আমি তোমাকে আশীর্বাদ করি সহস্রমাল্য তুমি সুখী হও, সকলের সুখের কারন হও.. আর সম্মানের সহিত বাকি জীবন অতিবাহিত কর।"
আর বাস্তবিকই, সহস্রমাল্য আর তাহার জননী তাহাদের বাকি জীবন সৎপথে চলিয়া, সকলের সাহায্য করিয়া বেশ সুখেই অতিবাহিত করিয়াছিল।
(সমাপ্ত)
0 Comments