সূর্যকে পরিক্রমণকালে পৃথিবীর চারটি অবস্থায় বাংলাদেশে বিরাজমান ঋতু পরিবর্তন বিষয়ক একটি প্রতিবেদন প্রণয়ন
সূচনা: তাপমাত্রার পার্থক্য অনুসারে সারা বছরকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়। এ প্রতিটি ভাগকে এক একটি ঋতু বলে। তাপমাত্রার পার্থক্য অনুসারে সারা বছরকে চারটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এগুলো হলো- গ্রীষ্মকাল, শরৎকাল, শীতকাল ও বসন্ত কাল। আমরা জানি, পুরো পৃথিবীকে দুটো গোলার্ধে ভাগ করা হয়েছে। নিরক্ষরেখার উপরের দিকের অংশকে উত্তর গোলার্ধ এবং নিচের দিকের অংশকে দক্ষিণ গোলার্ধ ধরা হয়। উত্তর গোলার্ধে যখন গ্রীষ্মকাল দক্ষিণ গোলার্ধে তখন শীতকাল। আবার উত্তর গোলার্ধে যখন শীতকাল দক্ষিণ গোলার্ধে তখন গ্রীষ্মকাল। তেমনি উত্তর গোলার্ধে যখন বসন্তকাল
দক্ষিণ গোলার্ধে তখন শরৎকাল। আবার উত্তর গোলার্ধে যখন শরৎকাল দক্ষিণ গোলার্ধে তখন বসন্তকাল। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান উত্তর গোলার্ধে। এখানে জুন মাসের দিকে গরম বেশি অনুভূত হয়। এই সময়ে দক্ষিণ গোলার্ধে শীতকাল । প্রতিবেদনটিতে ঋতু পরিবর্তনের এরূপ চারটি অবস্থার কারণ জানতে পারব ।
ঋতু পরিবর্তনের কারণ ব্যাখ্যা : ক. ঋতু পরিবর্তনের কারণ
ঋতু পরিবর্তনের ৫টি কারণ সম্পর্কে নিম্নে আলোচনা করা হল-
(১) পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে দিবারাত্রির তারতম্যের জন্য উত্তাপের হ্রাস-বৃদ্ধি : পৃথিবীর ঘূর্ণনের কারণে সূর্য পৃথিবীর যে গোলার্ধের নিকট অবস্থান করে তখন সেই গোলার্ধে দিন বড় এবং রাত ছোট। তার বিপরীত গোলার্ধে রাত বড়, দিন ছোট। পৃথিবী দিনের বেলায় তাপ গ্রহণ করে ফলে ভূপৃষ্ঠ উত্তপ্ত হয় এবং রাতের বেলায় বিকিরণ করে শীতল হয়। তখন একটি স্থানে বড় দিনে যে তাপ গ্রহণ করে ছোট রাতে সে তাপ পুরোটা বিকিরণ করতে পারে না। ঐ স্থানে সঞ্চিত তাপের কারণে আবহাওয়া উষ্ণ হয় এবং তাতে গ্রীষ্মকালীন আবহাওয়া পরিলক্ষিত হয়। বিপরীত গোলার্ধে রাত বড় এবং দিন ছোট হওয়াতে দিনের বেলায় যে তাপ গ্রহণ করে রাতের বেলায় সব তাপ বিকিরণ করে ঠান্ডা অনুভূত হয় তখন শীতকাল।
(২) পৃথিবীর গোলাকার আকৃতি : পৃথিবী গোল, তাই পৃথিবীর কোথাও সূর্যরশ্মি লম্বভাবে পড়ে আবার কোথাও তির্যকভাবে পড়ে। ফলে তাপমাত্রার পার্থক্য হয় এবং ঋতু পরিবর্তিত হয়।
(৩) পৃথিবীর উপবৃত্তাকার কক্ষপথ : পৃথিবীর আবর্তন পথ উপবৃত্তাকার তাই বছরের বিভিন্ন সময় সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্ব কম-বেশি হয়। এতে তাপমাত্রার পার্থক্য হয়, তাই ঋতু পরিবর্তিত হয়।
(৪) বার্ষিক গতির কারণে : পৃথিবীর বার্ষিক গতির জন্য সূর্যকিরণ বিভিন্ন স্থানে কম-বেশি পড়ার কারণে বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রার পার্থক্য ঘটছে। ফলে বিভিন্ন স্থানে জলবায়ুর বিভিন্নতা হয়। একে ঋতু পরিবর্তন বলে।
(৫) পৃথিবীর কক্ষপথে কৌণিক অবস্থান : সূর্যকে পরিক্রমণের সময় নিজ কক্ষতলের সঙ্গে পৃথিবীর মেরুরেখা সমকোণে না থেকে ৬৬.৫০ কোণে হেলে একই দিকে অবস্থান করে। এতে বছরে একবার পৃথিবীর উত্তর মেরু ও দক্ষিণ মেরু সূর্যের নিকটবর্তী হয়। যে গোলার্ধ যখন সূর্যের দিকে ঝুঁকে থাকে সে গোলার্ধে সূর্য লম্বভাবে কিরণ দেয়। তার তাপমাত্রা তখন বেশি হয় এবং দূরে গেলে তাপমাত্রা কম হয়, ফলে ঋতু পরিবর্তন ঘটে।
ঋতু পরিবর্তন প্রক্রিয়ায় পৃথিবীর চারটি অবস্থার চিত্র:
উপরের চিত্র অনুযায়ী সূর্যকে পরিক্রমণকালে পৃথিবীর চারটি অবস্থা থেকে ঋতু পরিবর্তনের ধারণা পাওয়া যায়। এখন আমাদের চারটি ঋতু গ্রীষ্মকাল, শরৎকাল, শীতকাল ও বসন্ত কাল কীভাবে পরিবর্তিত হয় তার ব্যাখ্যা লিখবো -
উত্তর গোলার্ধে গ্রীষ্মকাল ও দক্ষিণ গোলার্ধে শীতকাল : ২১শে মার্চের পর থেকে পৃথিবী তার নিজ কক্ষপথে এগিয়ে চলার সঙ্গে সঙ্গে উত্তর মেরু ক্রমশ সূর্যের দিকে হেলতে থাকে। এর সঙ্গে সঙ্গে যত দিন যায় তত উত্তর মেরুতে আলোকিত অংশ বাড়তে থাকে। এভাবে ২১শে জুনে গিয়ে সূর্য কর্কটক্রান্তিরেখার উপর লম্বভাবে কিরণ দিতে থাকে। ফলে ২১শে জুন উত্তর গোলার্ধে বড় দিন এবং ছোট রাত হয়। ঐ দিনই সূর্যের উত্তরায়ণের শেষ এবং তার পরের দিন থেকে পুনরায় সূর্য দক্ষিণ দিকে আসতে থাকে। দিন বড় হওয়ার কারণে উত্তর গোলার্ধে ২১শে জুনের দেড় মাস পূর্ব থেকেই গ্রীষ্মকাল শুরু হয় এবং পরের দেড় মাস পর্যন্ত গ্রীষ্মকাল স্থায়ী হয়। এই সময়ে দক্ষিণ গোলার্ধে ঠিক বিপরীত অবস্থা দেখা যায় অর্থাৎ শীতকাল অনুভূত হয়।
এ সময় সূর্য হেলে থাকার কারণে এ গোলার্ধে সূর্য কম সময় ধরে কিরণ দেয়। ফলে দিন ছোট এবং রাত বড় হয়। দিনে ভূপৃষ্ঠ যতটুকু উত্তপ্ত হয়, রাতে তাপ বিকিরণের ফলে তা ঠান্ডা হয়ে যায়। এখানে তখন শীতের আবহাওয়া বিরাজ করে। দক্ষিণ গোলার্ধে এ সময়কে শীতকাল বলে ।
উত্তর গোলার্ধে শরৎকাল ও দক্ষিণ গোলার্ধে বসন্তকাল : ২১শে জুন থেকে দক্ষিণ মেরু সূর্যের দিকে হেলতে থাকে। উত্তর গোলার্ধের অংশগুলো কম কিরণ পেতে থাকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধের অংশগুলো বেশি সূর্যকিরণ পেতে থাকে। এভাবে ২৩শে সেপ্টেম্বর সূর্য নিরক্ষরেখার উপর লম্বভাবে কিরণ দেয়। তাই এ সময় পৃথিবীর সর্বত্র দিন ও রাত্রি সমান হয়। দিনের বেলায় যে তাপ আসে রাত সমান হওয়ায় একই পরিমাণ তাপ বিকিরিত হওয়ার সুযোগ পায়। ফলে আবহাওয়াতে ঠান্ডা গরমের পরিমাণ সমান থাকে। এই সময় উত্তর গোলার্ধে শরৎকাল ও দক্ষিণ গোলার্ধে বসন্ত কাল বিরাজ করে। ২৩শে সেপ্টেম্বরের দেড় মাস আগে থেকেই উত্তর গোলার্ধে শরৎকালের সূচনা হয় এবং দেড় মাস পর পর্যন্তএই শরৎকাল
স্থায়ী থাকে।
উত্তর গোলার্ধে শীতকাল ও দক্ষিণ গোলার্ধে গ্রীষ্মকাল : ২৩শে সেপ্টেম্বরের পর দক্ষিণ গোলার্ধ ক্রমশ সূর্যের দিকে হেলতে থাকে। এই সময় দক্ষিণ গোলার্ধ সূর্যের কাছে আসতে থাকে। উত্তর গোলার্ধ দূরে সরতে থাকে। ফলে দক্ষিণ গোলার্ধে সূর্য লম্বভাবে এবং উত্তর গোলার্ধে কোণ করে কিরণ দিতে থাকে। এতে উত্তর গোলার্ধে দিন ছোট ও দক্ষিণ গোলার্ধে দিন বড় এবং রাত ছোট হতে থাকে। এর মধ্যে ২২শে ডিসেম্বর সূর্য মকরক্রান্তির উপর লম্বভাবে কিরণ দেয়। সেই দিন উত্তর গোলার্ধে ছোট দিন ও বড় রাত হওয়াতে শীতকাল। ঐ দিনই সূর্যের দক্ষিণায়নের শেষ এবং তার পরের দিন থেকো পুনরায় সূর্য উত্তর দিকে আসতে থাকে। ২২শে ডিসেম্বরের দেড় মাস পূর্বেই উত্তর গোলার্ধে শীতকাল শুরু হয় এবং পরের দেড় মাস পর্যন্ত বিরাজ করে। এই সময়টাতে দক্ষিণ গোলার্ধে গ্রীষ্মকাল।
উত্তর গোলার্ধে বসন্তকাল ও দক্ষিণ গোলার্ধে শরৎকাল : পৃথিবী তার কক্ষপথে চলতে চলতে ২২শে ডিসেম্বরের পর থেকে ২১শে মার্চ পর্যন্তএমন স্থানে ফিরে আসে যখন সূর্য নিরক্ষরেখার উপর লম্বভাবে কিরণ দিতে থাকে। ফলে ২১শে মার্চ পৃথিবীর সর্বত্র দিনরাত্রি সমান হয়। দিনের বেলায় সূর্যকিরণের কারণে ভূপৃষ্ঠের বায়ুস্তর গরম হয় এবং রাত্রিবেলায় বিকিরিত হয়ে ঠান্ডা হয়। এই সময় উত্তর গোলার্ধে বসন্ত কাল ও দক্ষিণ গোলার্ধে শরৎকাল। ২১শে মার্চ পৃথিবীর সর্বত্র দিনরাত্রি সমান হয় এবং ঐ দিনটিকে বাসন্তবিষুব বা মহাবিষুব বলে।
পৃথিবীর ঋতুচক্র --
ঋতু পরিবর্তন প্রক্রিয়ায় পৃথিবীর চারটি অবস্থায় বাংলাদেশে বিরাজমান ঋতুর ব্যাখ্যা-
বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে উত্তর গোলার্ধে অবস্থিত। এখন ঋতু পরিবর্তন প্রক্রিয়ায় পৃথিবীর চারটি অবস্থায় বাংলাদেশে বিরাজমান ঋতুর ব্যাখ্যা করা হলো –
১। উত্তর গোলার্ধে গ্রীষ্মকাল ও দক্ষিণ গোলার্ধে শীতকাল :
বাংলাদেশ উত্তর গোলার্ধে হওয়ায় ২১শে জুন এখানে দীর্ঘতম দিন এবং ক্ষুদ্রতম রাত্রি হয়। এই ২১শে জুনের আগের দেড় মাস এপ্রিল-মে হওয়ায় বাংলাদেশে গ্রীষ্মকাল থাকে কারণ মে থেকে মধ্যজুন এদেশে গ্রীষ্মকাল এবং পরের দেড় মাস জুন-জুলাই হওয়ায় বর্ষাকাল থাকে ।
২। উত্তর গোলার্ধে শরৎকাল ও দক্ষিণ গোলার্ধে বসন্তকাল :
২৩শে সেপ্টেম্বর সূর্যরশ্মি নিরক্ষরেখার উপর লম্বভাবে পড়ে এবং সর্বত্র দিবা-রাত্রি সমান হয়। এ তারিখের দেড় মাস পূর্ব অর্থাৎ আগষ্ট-সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশে বর্ষাকাল ও শরৎকাল বিরাজ করে এবং মধ্য সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবরে শরৎকাল ও হেমন্তকাল বিরাজ করে ।
৩। উত্তর গোলার্ধে শীতকাল ও দক্ষিণ গোলার্ধে গ্রীষ্মকাল :
২২শে ডিসেম্বর দুই গোলার্ধে দিনরাত সমান হয়। এ তারিখের দেড় মাস পূর্ব অর্থাৎ নভেম্বর থেকে মধ্য ডিসেম্বরে দেশে হেমন্তকাল ও শীতকাল বিরাজ করে । এবং পরেরও দেড়মাস অর্থাৎ মধ্য ডিসেম্বর-জানুয়ারীতে তীব্র শীতকাল দেখা যায় ।
৪। উত্তর গোলার্ধে বসন্তকাল ও দক্ষিণ গোলার্ধে শরৎকাল :
২১শে মার্চ তারিখে উত্তর ও দক্ষিণ দুই গোলার্ধেই দিনরাত্রী সমান হয় । এ তারিখের দেড় মাস পূর্ব পর্যন্ত অর্থাৎ ফেব্রুয়ারী থেকে মধ্য মার্চে বাংলাদেশে শীতকাল ও বসন্তকাল বিরাজ করে এবং পরের দেড় মাস অর্থাৎ মধ্য মার্চ থেকে এপ্রিলে দেশে পুরোপুরি বসন্তকাল বিরাজ করে ।
উপসংহার- সূর্যের অবস্থান ও ভৌগোলিক কারণে বাংলাদেশে মূলত উপরোক্ত চারটি অবস্থা পরিলক্ষিত হয় যদিও আমাদের দেশ কে ষড়ঋতুর দেশ বলা হয়। এরূপ ঋতু পরিবর্তনের ফলে মানুষের জীবন যাত্রার মাঝে পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় । জীবজগতের বিস্তার, পেশাগত , অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ভিন্নতা চোখে পড়ে তাছাড়া নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগও সংঘটিত হয় ।


0 Comments