لهان (লাহন) এর পরিচয় ও গুরুত্ব : একটি বিশ্লেষণ

 


                              لهان  (লাহন) এর পরিচয় ও গুরুত্ব : একটি বিশ্লেষণ 


ক. لهان (লাহন) এর সংজ্ঞা 


লাহন শব্দের শাব্দিক অর্থ হচ্ছে ভুল বা অশুদ্ধ। তাজবীদের বিপরীত কুরআন মাজীদ তিলাওয়াত  বা পড়াকে লাহন বলে। অর্থাৎ তাজবিদের নিয়ম কানুন লঙ্ঘন করে কুরআন তিলাওয়াত করাকে (লাহন) لهان বলে । যেমন তিলাওয়াত এর সময় এক অক্ষরের জায়গায় আরেক অক্ষরের উচ্চারণ করা অথবা যেভাবে উচ্চারণ করা প্রয়োজন তেমনটি না করে কিছুটা চিকন বা মোটা অথবা বেশি বা কম টেনে পড়া । উদাহরণ –  قُلۡ এর জায়গায়  كُلۡবলা। 


খ. لهان (লাহন) এর প্রকার 

লাহন দুই প্রকার । যথা – 

১) লাহনে জলী বা মারাত্নক ভুল

লাহনে জলী অর্থ মারাত্নক ভুল। কুরআন পড়ার যেসব অবশ্যই পালনীয় নিয়ম-নীতি আছে সেগুলোর লংঘন করাকে লাহনে জলী বলা হয়। যেমন

এক অক্ষরের স্থলে আরেক অক্ষর পড়া, কোন অক্ষর বাড়িয়ে দেয়া যেমন اَحَدْ ‘আহাদ’ শব্দটি উচ্চারণ করার সময় ‘আ’ বলে হাদ বলতে এক মুহুর্তও দেরী করলে ‘আ’ এর হামযার সাথে আরেকটি হামযা যোগ হয়ে উচ্চারণ হয়ে গেল اَـاحَد ‘ আ-হাদ’, কোন অক্ষর এর উচ্চারণ কমিয়ে দেয়া যেমন, يُوْلَد ‘  ইউ-লাদ’ কে يُلَد ‘ ইউলাদ’ পড়া, এখানে অয়াও পেশের উচ্চারণ বাদ পড়ে গেল, আবার যের, যাবার, পেশ ও সাকিনের একটির স্থানে আরকেটি পড়া যেমন, اِهْدِنَـا ‘ ইহ্দিনা’ শব্দটিকে اِهِدِنَـا ‘ ইহিদিনা’ পড়া, এখানে ‘হা’ এ সাকিনের স্থানে যের হয়ে গেল, অক্ষরগুলোকে তার মাখরাজ থেকে অর্থা‌ৎ মুখ ও গলা’র যেসব স্থান থেকে আদায় করা দরকার তা না করা, তাশদীদ যুক্ত অক্ষরকে বিনা তাশদীদে পড়া, মাদে’র স্থানে মাদ না করা এবং মাদ নেই এরকম স্থানে মাদ করা।

২ ) লাহনে খফী বা ছোট ভুল

কুরআন পড়ার যেসব তাজবীদ বা নিয়ম-নীতি আছে সেসব ঠিকভাবে আদায় না করাকে লাহনে খফী বলা হয়।হরফকে সুন্দর করে উচ্চারণ করার নির্দিষ্ট নিয়ম-কানুনের বিপরীত পড়াকেও  লাহনে খফী বলে। এ রকম পড়া মাকরুহ; তাই এ থেকেও বেচে থাকা উচিৎ।
 কয়েকটি লাহনে খফীর উদাহরণ;

মোটা অক্ষরগুলোকে পাতলা পড়া যেমন ‘খ’ যাবার ‘খ’ না পড়ে ‘খা’ পড়া, ‘র’ যাবার ‘র’ না পড়ে ‘রা’ পড়া, ইক্বলাব, ইখফা’র নিয়ম না মেনে পড়া, যেমন ইখফার ‘নুন সাকিন’কে ‘ং’ (অনুস্বর) না পড়ে ‘নুন সাকিন’ই পড়া ইত্যাদি ।

গ. لهان (লাহন)এর প্রকারগুলোর মধ্যে পার্থক্য  


ঘ . لهان ( লাহন) এর প্রভাব 

প্রত্যেক কুরআন পাঠকের এই ভুলগুলো সম্বন্ধে জানা ও পড়ার সময় সচেতন থাকা উচি‌ৎ।হজরত আলী (রা.) বলেন, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) তোমাদের নির্দেশ দিয়েছেন যেন তোমরা প্রত্যেকেই এমনভাবে কোরআন পড়, যেভাবে তোমাদেরকে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। -ফাজায়েলুল কোরআন, ইমাম ক্বাসেম ইবনে সাল্লাম: পৃ: ৩৬১
অর্থাৎ হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবায়ে কেরামকে যেভাবে কোরআন শিক্ষা দিয়েছেন এবং পরবর্তী উম্মতকে সাহাবারা যেভাবে শিক্ষা দিয়েছেন সেই পরম্পরায় যেভাবে শুদ্ধভাবে কোরআন পড়ার রীতি চলে আসছে, সেভাবে কোরআন পড়তে হবে। অর্থাৎ প্রত্যেক হরফ স্বীয় মাখরাজ থেকে সিফাতে লাজেমাসহ উচ্চারণকরতঃ মদ-গুন্নাহ আদায় করে পড়তে হবে।

কোরআন শরিফ সুন্দর কন্ঠে পড়া প্রশংসনীয়। হাদিস শরিফে সুন্দর কন্ঠে পড়তে উৎসাহিত করা হয়েছে। হজরত বারা ইবনে আযেব (রা.) বলেন, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, তোমরা সুললিত কন্ঠে কোরআন শরিফ পড়, কেননা তা কোরআনের সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দেয়। -শোয়াবুল ঈমান, হাদিস: ২১৪১

তবে গানের সুরে কোরআন তেলাওয়াত নয়। এটা বরং কোরআন অবমাননার শামিল হওয়ায় তা বর্জনীয়। এমনকি গানের সুরে পড়তে গিয়ে হরফ কমবেশি হলে বা এক হরফের স্থলে অন্য হরফ আদায় করা হলে লাহনে জলি হবে এবং এতে অর্থ বিগড়ে গেলে নামাজ ভেঙে যাবে। -রদ্দুল মুহতার: ১/৬৩৩

নামাজের কেরাতে বিপরীত অর্থ হয়ে যায়, এমন ভুল পড়লে নামাজ নষ্ট হয়ে যাবে, চাই তা তিন আয়াত পরিমাণের ভিতর হোক বা পরে হোক সর্বাবস্থায় একই হুকুম। পক্ষান্তরে সাধারণ ভুল যার দ্বারা অর্থ একেবারে বিগড়ে না যায়, নামাজ নষ্ট হবে না। -খুলাসাতুল ফাতাওয়া: ১/১১৮, ফাতাওয়া কাজিখান: ১/৬৭

তবে সূরা-কেরাত ও নামাজের তাসবিহ ইত্যাদি শুদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত নামাজ ছেড়ে দেওয়ার অনুমতি নাই। সূরা-কেরাতও শুদ্ধ করতে থাকবে এবং নামাজও আদায় করতে থাকবে, কিন্তু এ ধরণের লোকেরা শুদ্ধ পাঠকারী ব্যক্তির ইমামতি করবে না। -হিদায়া: ১/৫৮, জাওয়াহিরুল ফিকহ: ১/৩৩৯


Post a Comment

0 Comments