মানব জাতির হেদায়াতে আল-কুরআন : প্রসঙ্গ সুরা আলে-ইমরান

 


                         মানব জাতির হেদায়াতে আল-কুরআন : প্রসঙ্গ সুরা আলে-ইমরান 


ক. নির্দেশনায় উদ্ধৃত আয়াত সমূহের বঙ্গানুবাদঃ  

১ নং আয়াত এর বঙ্গানুবাদ

الٓمَّٓ ۙ﴿۱﴾

আলিফ-লাম-মীম।

২ নং আয়াত এর বঙ্গানুবাদ

اللّٰهُ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا هُوَ ۙ الۡحَیُّ الۡقَیُّوۡمُ ؕ﴿۲﴾

আল্লাহ, তিনি ছাড়া সত্যিকারের কোন ইলাহ নেই, তিনি চিরঞ্জীব সকলের রক্ষণাবেক্ষণকারী।

৩ নং আয়াত এর বঙ্গানুবাদ
نَزَّلَ عَلَیۡکَ الۡکِتٰبَ بِالۡحَقِّ مُصَدِّقًا لِّمَا بَیۡنَ یَدَیۡهِ وَ اَنۡزَلَ التَّوۡرٰىۃَ وَ الۡاِنۡجِیۡلَ ۙ﴿۳﴾

তিনি সত্য সহকারে তোমার উপর কিতাব অবতীর্ণ করেছেন, যা পূর্বতন কিতাবের সমর্থক এবং তিনি তাওরাত ও ইঞ্জীল অবতীর্ণ করেছেন । 

৪ নং আয়াত এর বঙ্গানুবাদ
مِنۡ قَبۡلُ هُدًی لِّلنَّاسِ وَ اَنۡزَلَ الۡفُرۡقَانَ ۬ؕ اِنَّ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا بِاٰیٰتِ اللّٰهِ لَهُمۡ عَذَابٌ شَدِیۡدٌ ؕ وَ اللّٰهُ عَزِیۡزٌ ذُو انۡتِقَامٍ ﴿۴﴾

ইতোপূর্বে মানবজাতির পথ প্রদর্শনের জন্য; আর তিনি সেই মানদন্ড নাযিল করেছেন যা হাক্ব ও বাতিলের পার্থক্য দেখিয়ে দেয়; নিশ্চয়ই যারা আল্লাহর আয়াতের সাথে কুফুরী করে, তাদের জন্য কঠিন শাস্তি রয়েছে। আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী, দন্ডদাতা। 

১-৪ নং আয়াতের শানে নুযূল:

আল্লামা বাগবী (র.) কালবী এবং রবি ইবনে আনাস (রা.) এর কথার উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেন, এই আয়াতসমূহ নাজরানের প্রতিনিধি দলের সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়। এই প্রতিনিধি দলের লোক সংখ্যা ছিল ষাট। তারা উষ্ট্রের ওপর আরোহন করে এসেছিল। ষাটজনের এই দলের মধ্যে চৌদ্দজন ছিল উপনেতা। আর তিনজন ছিল নেতা। আহকেবের নামক এক ব্যক্তি ছিল সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব যার পরামর্শ ছাড়া দলের কোনো লোক কোনো কাজ করত না। আহকেবের আসল নাম ছিল আব্দুল মাসিহ। প্রিয় নবী (সা.) যখন আসর নামাজ পড়েছেন তখন তারা মসজিদে প্রবেশ করে। তারা অত্যন্ত মূল্যবান এবং সুন্দর পোশাকে সুসজ্জিত ছিল। তাদের নামাজের সময় হলে প্রিয়নবী (সা.) এর অনুমতি নিয়ে তারা পূর্ব দিকে মুখ করে নিজেদের নামাজ আদায় করে। প্রিয় নবী (সা.) তাদেরকে ইসলাম কবুল করার আহবান জানালেন। তারা বলল, আমরা তো আপনার পূর্বেই ইসলাম কবুল করেছি। প্রিয় নবী (সা.) বললেন, তোমরা অসত্য কথা বলছো, তোমাদেরকে যে বিষয়টি ইসলাম থেকে বিরত রাখছে তা হলো হযরত ঈসা (আ.)-কে আল্লাহর পুত্র দাবী করা। তোমরা ক্রসেডের পূজা কর এবং শুকরের গোশত খাওয়াকে হালাল বলে মনে কর।

তখন তারা বলল, যদি আল্লাহপাক ঈসা (আ.) এর পিতা না হন তাহলে তার পিতা কে? প্রিয় নবী (সা.) এরশাদ করলেন, তোমরা কি জান না যে, আমাদের পালনকর্তা সব কিছুর নিয়ন্ত্রণকর্তা, সবার নেগাহবান এবং রিজিকদাতা। তারা বলল, হ্যাঁ একথাও সত্য। তখন প্রিয়নবী (সা.) জিজ্ঞাসা করলেন, এই সব কাজের কোনোটি ঈসা (আ.) এর নিয়ন্ত্রনাধীন রয়েছে কি? খৃষ্টান প্রতিনিধিদল বলল, না। প্রিয় নবী (সা.) এরশাদ করলেন, তোমরা কি জানো না যে, আল্লাহ পাকের নিকট আসমান জমিনের কোনো কিছুই গোপন নেই। তখন তারা বলল, জানবো না কেন। নবী (সা.) এরশাদ করলেন তাহলে তোমরা বলো ঈসা (আ.)-কে যে খাছ এলেম আল্লাহ পাক দান করেছেন তা ছাড়া এই সব বিষয়ে তিনি কিছু কি জানতেন? তারা বলল, না। 

প্রিয় নবী (সা.) এরশাদ করলেন, আমাদের প্রতিপালক তার ইচ্ছা মোতাবেক ঈসা (আ.) কে মাতৃগর্ভে আকৃতি দান করেছেন। আমাদের প্রতিপালক পানাহার করেন না। প্রতিনিধি দল বলল, জ্বী হ্যাঁ! প্রিয় নবী (সা.) এরশাদ করলেন, তোমরা একথা উপলব্দি কর না যে, ঈসা (আ.)-কে তার মা এভাবেই তিনি ভূমিষ্ট করেছেন যেভাবে সাধারণত ভূমিষ্ট হয়।

ঈসা (আ.)-কে এভাবেই আহার প্রদান করা হয়েছে যেভাবে শিশুদেরকে প্রদান করা হয়। আর ঈসা (আ.) পানাহার করতেন। প্রশ্রাব পায়খানাও করতেন। প্রতিনিধি দল বলল, হ্যাঁ এসব কথা আমরা জানি। তখন তিনি এরশাদ করলেন, তাহলে তোমরাই বলো তোমাদের দাবী মোতাবেক ঈসা (আ.) আল্লাহর পুত্র কিভাবে হতে পারে? এ কথার পর প্রতিনিধিদল নিরব হয়ে যায়। তখন আল্লাহ পাক সূরায়ে আলে ইমরানের প্রথম ৮০ টি আয়াত নাজিল করেন। (নুরুল কোরআন-১৫৬)। 

* আয়াতগুলোর ব্যাখ্যা –
                                   ১ নং আয়াতঃ
 আলিফ, লাম, মীম এ হরফগুলোকে কুরআনের পরিভাষায় ‘হরফে মুকাত্তা'আত' বলা হয়। উনত্রিশটি সূরার প্রারম্ভে এ ধরনের হরফে মুকাত্তা’আত ব্যবহার করা হয়েছে। এগুলোর সংখ্যা ১৪টি। কি অর্থে এবং এসব আয়াত বর্ণনার কি রহস্য রয়েছে এ ব্যাপারে মুফাসসিরগণের মধ্যে বিভিন্ন মত রয়েছে। এক্ষেত্রে সর্বমোট প্রসিদ্ধ অভিমত হচ্ছে চারটিঃ 
১) এগুলোর কোন অর্থ নেই, কেবলমাত্র আরবী বর্ণমালার হরফ হিসেবে এগুলো পরিচিত। 
২) এগুলোর অর্থ আছে কিনা তা আল্লাহই ভাল জানেন, আমরা এগুলোর অর্থ সম্পর্কে কিছুই জানিনা। আমরা শুধুমাত্র তিলাওয়াত করবো। 
৩) এগুলোর নির্দিষ্ট অর্থ রয়েছে, কারণ কুরআনের কোন বিষয় বা কোন আয়াত বা শব্দ অর্থহীনভাবে নাযিল করা হয়নি। কিন্তু এগুলোর অর্থ শুধুমাত্র আল্লাহ তা'আলাই জানেন। অন্য কেউ এ আয়াতসমূহের অর্থ জানেনা, যদি কেউ এর কোন অর্থ নিয়ে থাকে তবে তা সম্পূর্ণভাবে ভুল হবে। আমরা শুধু এতটুকু বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ্ তা'আলা তার কুরআনের কোন অংশ অনর্থক নাযিল করেননি। 
৪) এগুলো মুতাশাবিহাত বা অস্পষ্ট বিষয়াদির অন্তর্ভুক্ত। এ হিসাবে অধিকাংশ সাহাবী, এমনি রহস্যপূর্ণ যার প্রকৃত মর্ম ও মাহাত্ম্য একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলাই জানেন।

                                      ২ নং আয়াতঃ 

আল্লাহর কিছু গুণাবলীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ সমস্ত পূর্ণতার অধিকারী এবং তিনি সমস্ত দোষ ও অপূর্ণতা থেকে মুক্ত। আল্লাহ শুধু সত্ত্বাগতভাবে নন, গুণাবলীর দিক থেকেও তিনি অদ্বিতীয় এবং অতুলনীয়। আমাদের জ্ঞান ও শক্তি সীমিত। আল্লাহর সত্ত্বা অসীম ও স্থায়ী। আমরা অতীতে ছিলাম না এবং ভবিষ্যতেও থাকব না। কিন্তু আল্লাহ সব সময়ই ছিলেন,এখনও আছেন এবং ভবিষ্যতেও থাকবেন। তাই একমাত্র তিনিই প্রশংসা পাবার ও উপাস্য হবার যোগ্য। আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছু বা অন্য কেউই উপাস্য বা প্রভু হবার যোগ্য নয়।
কারো ক্ষমতা, সম্পদ ও পদের কারণে তার সামনে নত না হয়ে একমাত্র আল্লাহর বন্দেগী বা উপাসনা করা উচিত। কারণ, অন্যদের যতই ক্ষমতা ও সম্পদ থাকুক না কেন তা আল্লাহরই দান। আর আল্লাহ সব ধরণের দোষ, ত্রুটি এবং অপূর্ণতা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।

 ৩ ও ৪ নং আয়াতঃ  

রাসুল (সা.)-র যুগে ঐশীগ্রন্থের কোন কোন অনুসারী তওরাত ও ইঞ্জিল / ইনজিল অবতীর্ণ হবার পর অন্য আরেকটি গ্রন্থ অবতীর্ণ হওয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করত। তারা ইসলামের নবী ও কোরআনের প্রতি ঈমান আনতে রাজী ছিল না। এই আয়াতে তাদের আপত্তির জবাবে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ বিভিন্ন যুগে মানুষের পথ প্রদর্শনের জন্য অনেক নবী মনোনীত করেছেন এবং নবীদের মধ্যে কারো কারো কাছে গ্রন্থ ও নতুন বিধান বা শরীয়ত দিয়েছেন। এই সব নবী ও ঐশী গ্রন্থ একে অপরের সত্যতার স্বীকৃতি দিয়েছে। কারণ সমস্ত নবী ও ঐশী গ্রন্থ আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে এবং এসবই সত্য ও যথার্থ। আর এতে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। যে আল্লাহ, মুসা ও ঈসা (আ.)'র কাছে যথাক্রমে তওরাত ও ইঞ্জিল নাজেল করেছেন, তিনিই মুহাম্মদ (সা.)'র কাছে কোরআন নাজিল করেছেন। তাই কেউ যদি সত্যের অনুসারী হয়, তাহলে তাদেরকে পবিত্র কোরআনের প্রতিও ঈমান আনতে হবে। যদি কেউ কোরআনকে সত্য বলে বিশ্বাস না করে, তাহলে সে দুনিয়া ও পরকালে আল্লাহর শাস্তির মুখোমুখী হবে এবং এই শাস্তি থেকে বাঁচার কোন পথ নেই। তাই সত্যকে জানার ক্ষেত্রে যখনই অসুবিধা বা অস্পষ্টতা দেখা দেবে, তখনই পবিত্র কোরআনকে সত্য ও মিথ্যা যাচাইয়ের মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।

খ। প্রধান আসমানি কিতাব সমূহের পরিচয় ও মানব জাতির হেদায়াতে আল-কুরআনঃ


আল্লাহর প্রেরিত আসমানি কিতাবের সংখ্যা একশত চারটি। এর মাঝে ১. তাওরাত ২. যাবুর/ জবূর ৩. ইনজিল ৪. কুরআন - এ চারটি আসমানি কিতাব বড় বা বিখ্যাত। বাকি আরো যত ছোট বা অখ্যাত আসমানি কিতাব রয়েছে তাকে সহিফা বলা হয়।

১। তাওরাত
ইসলাম ধর্মীয় বিশ্বাস এবং আল কুরআন-এর মতে, তাওরাত(তোরাহ) হচ্ছে নবী হযরত মূসা (আ)-এর প্রতি অবতীর্ণ সর্বপ্রথম প্রধান আসমানী কিতাব।হিব্রু ভাষায় এর নাম তোরাহ্‌। তোরাহ্‌ শব্দের অর্থ "আইন", "নিয়ম", বা "শিক্ষণীয় উপদেশ"। এটি ৫ টি পুস্তকের সমন্বয়ে গঠিত। তাই তাওরাতকে অনেকে মুসার "পঞ্চ পুস্তক" বলে থাকে। ইসলামী ধর্ম বিশ্বাস মতে তাওরাত মুহাম্মদ এর পূর্ববর্তী নবী মুসার উপর অবতীর্ণ একটি আসমানি কিতাব,যা এখন রহিত হয়ে গেছে।মুসলিমরা আরো ধারনা করে যে বর্তমানে উপলব্ধ তাওরাত বহু বছর ধরে দুর্নীতি এবং বিকৃতির শিকার হয়েছে তাই এটি আর এখন নির্ভরযোগ্য নয়। নবী মূসা (আ) এবং তাঁর ভাই হারুন (হিরান) ইস্রায়েলের লোকদের নিকট ঈশ্বরের বার্তা প্রচার করার জন্য তাওরাত ব্যবহার করেছিলেন।

২। যাবুর/ জবূর

ইসলাম ধর্মীয় বিশ্বাস এবং আল কুরআনের মতে, যাবুর/ জবূর হচ্ছে ইসলামের দ্বিতীয় বৃহত্তম কিতাব যা হযরত দাউদ (আ.) এর অবতীর্ন হয়। ইসলাম ধর্মবিশ্বাস অনুসারে নবী দাউদ আ: (দায়ূদ) -এর উপর কুরআনের পূর্বেও মহান আল্লাহ কর্তৃক অবতীর্ণ একটি পবিত্র গ্রন্থ বা আসমানী কিতাব। তবে প্রায়শই একে গীতসংহিতা বই হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়, যা রাজা দায়ূদ (দাউদ) -এর নিকট প্রকাশিত পবিত্র ধর্মগ্রন্থ হিসাবে চিহ্নিত হয়েছিল। পণ্ডিতরা প্রায়শই গীতসংহিতা বইটিকে কোনও আইন পরিচালিনার বই নয় বরং প্রার্থনার পবিত্র গানের বই হিসেবে বুঝিয়েছিলেন, যেগুলোকে সামসঙ্গীত বলে ডাকা হয়। বর্তমানের সামসঙ্গীতগুলি এখনও অনেক মুসলিম পণ্ডিতের দ্বারা প্রশংসিত, তবে মুসলমানরা সাধারণত ধরে নেন যে বর্তমানের কয়েকটি গীত পরবর্তীকালে রচিত হয়েছিল এবং সেগুলো ঐশ্বিকভাবে প্রকাশিত হয়নি।এটি হিব্রু ভাষায় লিখিত। হযরত দাউদ -এর পুত্র হযরত সুলায়মান-এর রাজত্ব কালেও এটি পবিত্র ধর্মগ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হত। 

৩। ইনজিল

ইনজিল (আরবি: جينجيل,  ইঞ্জিল, ইনজিল বা ইনজিল ) হ'ল ঈসার সুসমাচারের (ঈশ্বর প্রদত্ত গ্রন্থ Godspell) আরবি নাম। এই ইনজিলকে কুরআন দ্বারা চারটি ইসলামিক পবিত্র গ্রন্থের একটি হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে, যা আল্লাহর দ্বারা ঈসা(আ) উপর অবতীর্ণ হয়েছিল।"ইনজিল" শব্দটি কুরআন, হাদীস এবং আদি মুসলিম দলিলগুলিতেও ব্যবহৃত হয়েছিল। ইসলামিক পণ্ডিত মতামত নির্বিশেষে, মুসলমানরা সাধারণত বিশ্বাস করে যে ইনজিল ঈসাকে প্রদত্ত সত্যিকারের সুসমাচারকে বোঝায়। আবার অনেক মুসলিম পণ্ডিত বিশ্বাস করে চলেছেন যে বাইবেলের সুসমাচারে কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে, শব্দ এবং শব্দের অর্থ বিকৃত হয়েছে, কিছু অংশকে দমন করা হয়েছে এবং অন্য কিছু যুক্ত করা হয়েছে। ঈশ্বরের একত্বের এক মূল নীতি (তাওহীদ) এবং ঈশ্বরের ঈশ্বরত্বের সম্পূর্ণতার অর্থ হ'ল ঈসা মশীহের পক্ষে ঈশ্বর অবতার বা ঈশ্বরের পুত্র হওয়া অসম্ভব এবং বাইবেলের সুসমাচারের বিপরীতে দাবি অবশ্যই পরবর্তী সংযোজনের কারণে হওয়া উচিত। তবুও, বাইবেলটিকে মুসলমানরা ঐতিহাসিক উৎস হিসাবে ব্যবহার করেছে।  

৪। কুরআন 

কুরআন হলো ইসলামের কেন্দ্রীয় ধর্মীয় পাঠ্যপুস্তক এবং সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ আসমানী কিতাব, যা আল্লাহর নিকট হতে সর্বশেষ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হযরত মুহাম্মদ(স.) এর অবতীর্ণ হয়েছে বলে মুসলিমরা বিশ্বাস করে।সম্পূর্ণ কুরআন ১১৪টি অধ্যায়ে বিভক্ত ( যার প্রত্যেকটিকে 'সূরা' বলে), অতঃপর আরো সহস্রাধিক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শ্লোকে বিভক্ত (যার প্রত্যেকটিকে 'আয়াত' বলে)। মুসলিমরা বিশ্বাস করে যে কুরআন মৌখিকভাবে নবী মুহাম্মদ(স.)-এর নিকট ফেরেশতা জিব্রাইল (আঃ) এর মাধ্যমে অবতীর্ণ হয়েছিল, যা ধীরে ধীরে সম্পন্ন হতে প্রায় ২৩ বছর সময় লেগেছিলে। কুরআন অবতীর্ণ হবার সময় মুহাম্মদ(স.)-এর ৪০ বছর বয়স ছিলো এবং কুরআন সম্পূর্ণ হতে হতে তাঁর বয়স ৬৩ তে এসে পৌছেছিলো। মুসলিমরা কুরআনকে মুহাম্মদ(স.)-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অলৌকিক শক্তি এবং তাঁর নবুওয়ত্বের প্রমাণ হিসেবে দাবি করে এবং একে ধারাবাহিক ঐশী বাণীগুলির পরিসমাপ্তি হিসেবে গন্য করে যা আদম(আ)-এর প্রতি অবতীর্ণ বার্তাগুলি দিয়ে শুরু হয়েছিল এবং মুহাম্মদ(স.)-এর উক্ত কিতাব দ্বারা শেষ হয়েছিল। এটি ধ্রুপদী আরবী সাহিত্যের সেরা কাজ হিসাবে বিবেচিত।      

* মানব জাতির হেদায়াতে আল-কুরআন কুরআন -

পবিত্র কুরআন স্বয়ং আল্লাহর তায়ালার বাণী যা সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর ওপর নাযিল করা হয়েছে। আর কুরআন আসমানী কিতাবসমূহের সর্বশেষ কিতাব। এর পর কিয়ামত পর্যন্ত আর কোন কিতাব নাযিল হবেনা। তাই কিয়ামত পর্যন্ত সকল সমস্যার সমাধান সম্বলিত আল-কুরআনই সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ আসমানী কিতাব। কুরআনে আল্লাহ বলেন: আলিফ-লাম-রা!এ কিতাব; যা আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে আপনি বিশ্বমানবতাকে তাদের প্রতিপালকের আদেশক্রমে অন্ধকারাচ্ছন্ন জীবন থেকে বের করে আনতে পারেন আলোকোজ্জল রাজপথে। যিনি মহাপরাক্রমশালী,সুপ্রশংসিত। (সূরা ইবরাহীম: ১)
আল-কুরআন বিশ্বজনীন গ্রন্থ: আল-কুরআন নির্দিষ্ট জাতি, গোষ্ঠী, সম্প্রদায়, দেশ বা কালকে কেন্দ্র করে নাযিল হয়নি। বরং সর্বোকালের সমগ্র বিশ্বমানবতার হেদায়াতের সওগাত নিয়ে নাযিল হয়েছে। তাই এটা চিরন্তন ও বিশ্বজনীন গ্রন্থ। আল্লাহ তায়ালা বলেন: রমযানের মাস, এ মাসেই কুরআন নাযিল করা হয়েছে , যা মানব জাতির জন্য পুরোপুরি হেদায়াত এবং এমন দ্ব্যর্থহীন শিক্ষা সম্বলিত, যা সত্য সঠিক পথ দেখায় এবং হক ও বাতিলের পার্থক্য সুস্পষ্ট করে দেয়। (সূরা আল-বাকারা: ১৮৫)

আল্লাহ আরো বলেন: প্রশংসা আল্লাহরই যিনি তাঁর বান্দার প্রতি এ কিতাব নাযিল করেছেন এবং এর মধ্যে কোনো বক্রতা রাখেননি । (সূরা কাহাফ-১)

আল্লাহর নাযিলকৃত জীবন বিধান আল্লাহর কুরআন নিরভুল ও অতীব বিশুদ্ধ গ্রন্থ। এর মধ্যে কোন সন্দেহের লেশমাত্র নেই। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে: এটি আল্লাহর কিতাব, এর মধ্যে কোন সন্দেহ নেই । (সূরা বাকারা:১)
হে নবী! তোমার রবের কিতাবের মধ্য থেকে যাকিছু তোমার ওপর অহী করা হয়েছে তা (হুবহু) শুনিয়ে দাও৷ তাঁর বক্তব্য পরিবর্তন করার অধিকার কারো নেই। (সূরা কাহাফ:২৭)
হে মুহাম্মাদ! ওদেরকে বলে দাও, নিজের পক্ষ থেকে এর মধ্যে কোন পরিবর্তন পরিবর্ধন করা আমার কাজ নয়।আমি তো শুধুমাত্র আমার কাছে যে অহী পাঠানো হয়, তার অনুসারী।  (সূরা ইউনুস:১৫)
মহাগ্রন্থ আল-কুরআন হচ্ছে সর্বশেষ পরিপূর্ণ জীবন বিধান। এতে মানব জাতীর পরিপূর্ণ সব সমস্যার সমাধান রয়েছে। এরপর কোন আসমানী কিতাব নাযিলের প্রয়োজনীয়তা নেই। কারণ এ গন্থে মানব জীবনের ইহকালিন ও পরকালীন সমস্ত বিষয় উল্লেখ রয়েছে: আমি এ কিতাব তোমার প্রতি নাযিল করেছি, যা সব জিনিস পরিষ্কারভাবে তুলে ধরে এবং যা সঠিক পথনির্দেশনা, রহমত ও সুসংবাদ বহন করে তাদের জন্য যারা আনুগত্যের শির নত করে দিয়েছে৷(সূরা আন-নাহল ৮৯)

আর ইসলামকে পরিপূর্ণ জীবন বিধান হিসাবে ঘোষণা দেয়া হয়েছে:মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন: আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিয়েছি, আমার নিয়ামত তোমাদের প্রতি সম্পূর্ণ করেছি এবং তোমাদের জন্য ইসলামকে তোমাদের দীন হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছি। (সূরা আল-মায়েদা: ৩)

আল-কুরআন অনুসরণেই পথহারা জাতির পথের দিশা পেতে পারে। কুরআন হচ্ছে মুত্তাকীদের জন্য হেদায়াত। কুরআনে এরশাদ হচ্ছে-এটি মানব জাতির জন্য একটি সুস্পষ্ট সর্তকবাণী এবং যারা আল্লাহকে ভয় করে তাদের জন্য পথনির্দেশ ও উপদেশ। (সূরা আলে- ইমরান -১৩৮)

গ। নির্দেশিত উল্লিখিত আয়াতাংশের ব্যাখ্যাঃ  

মুহকাম : মুহকাম অর্থ সুস্পষ্ট, বোধগম্য, মজবুত ইত্যাদি। মুহকাম আয়াতকে আল্লাহ তাআলা উম্মুল কিতাব তথা কোরআনের আসল (মূল) বিষয় বলেছেন। কেননা এসব আয়াত আসমানি শিক্ষার মূল ভিত্তি।‘মুহকাম’ শব্দটি ‘ইহকাম’ শব্দ হতে নেয়া হয়েছে যার অর্থ নিষিদ্ধ করা। এজন্যই যে সকল বিষয় অটল ও দৃঢ় তাকে ‘মুহকাম’ বলা হয়। কারণ তাতে কোনরূপ পতনের আশংকা নেই। যে কথা বা বক্তব্য সুস্পষ্ট ও অকাট্য তাকেও এ কারণে ‘মুহকাম’ বলা  হয়ে থাকে। 
সুতরাং ‘মুহকাম’ আয়াতসমূহ সেই সকল আয়াত যা এতটা সুস্পষ্ট যে,ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে বোঝাবার প্রয়োজন নেই,যেমন قل هو الله أحد   (বল,তিনি আল্লাহ্ এক),ليس كمثله شيء  (কোন কিছুই তাঁর অনুরূপ নয়),للذكر مثل حظ الانثيين  (একজন পুরুষের অংশ উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে দুজন নারীর সমান)। এরূপ সহস্র আয়াত মুহ্কাম আয়াতের অন্তর্ভুক্ত যাদের কোনটি আকীদা,কোনটি আহ্কাম,কোনটি ইতিহাস,কোনটি উপদেশ ও নৈতিক শিক্ষামূলক। কোরআনে ‘মুহ্কাম’ আয়াতসমূহ ‘উম্মুল কিতাব’ বা কিতাবের মূল ভিত্তি হিসেবে অন্যান্য আয়াতের ব্যাখ্যাকারী।

মুতাশাবিহ : মুতাশাবিহ অর্থ অস্পষ্ট ও রূপক। যেমন—কিয়ামত অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা, দাজ্জাল বের হওয়ার কথা, কোরআন মাজিদের সুরার প্রথমে বর্ণিত বিচ্ছিন্ন অক্ষর ইত্যাদি। এসব আয়াতের উদ্দেশ্য অস্পষ্ট ও অনির্দিষ্ট। এগুলো আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর মধ্যকার গোপন রহস্য। এগুলোর প্রকৃত অর্থ সম্পর্কে সর্বসাধারণ অবগত হতে পারে না। বরং এসব শব্দের তথ্যানুসন্ধানে প্রবৃত্ত হওয়া বৈধ নয়। এগুলোর মমার্থ আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না, তবে না জানলেও এগুলোর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা ফরজ। 

আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘তিনি আপনার প্রতি কিতাব নাজিল করেছেন। তাতে কিছু আয়াত রয়েছে সুস্পষ্ট, সেগুলোই কিতাবের মূল। আর অন্যগুলো রূপক। সুতরাং যাদের অন্তরে কুটিলতা রয়েছে তারা এর রূপকগুলোর অনুসরণ করে ফিতনা বিস্তার ও অপব্যাখ্যার উদ্দেশ্যে।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ৭) 

* নির্দেশিত উল্লিখিত  আয়াতাংশের ব্যাখ্যা-

  وَ مَا یَعۡلَمُ تَاۡوِیۡلَهٗۤ اِلَّا اللّٰهُ ۘؔ وَ الرّٰسِخُوۡنَ فِی الۡعِلۡمِ

অর্থ - অথচ আল্লাহ ছাড়া কেউ এর ব্যাখ্যা জানে না।

আল্লাহ তা'আলা কুরআনের সুস্পষ্ট ও অস্পষ্ট আয়াতের কথা উল্লেখ করে একটি সাধারণ মুলনীতি ও নিয়মের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। যার দ্বারা অনেক আপত্তি ও বাদানুবাদের অবসান ঘটে। এর ব্যাখ্যা এরূপ, কুরআনুল কারীমে দুই প্রকার আয়াত রয়েছে। এক প্রকারকে মুহকামাত তথা সুস্পষ্ট আয়াত এবং অপর প্রকারকে মুতাশাবিহ তথা অস্পষ্ট আয়াত বলা হয়।উল্লিখিত আয়াতে মুতাশাবিহ তথা অস্পষ্ট আয়াত সম্পর্কে বলা হয়েছে। 
ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, মুতাশাবিহ আয়াতসমূহ হচ্ছে, যা মানসূখ বা রহিত, যাতে উদাহরণ ও এ জাতীয় বিষয়াদি পেশ করা হয়েছে। [আত-তাফসীরুস সহীহ]

আল্লাহ্ তা'আলা বর্ণনা করেন যে, যারা সুস্থ স্বভাবসম্পন্ন তারা অস্পষ্ট আয়াত নিয়ে বেশী তথ্যানুসন্ধান ও ঘাটাঘাটি করে না; বরং তারা সংক্ষেপে বিশ্বাস করে যে, এ আয়াতটিও আল্লাহর সত্য কালাম।

তবে তিনি কোন বিশেষ হেকমতের কারণে এর অর্থ সম্পর্কে আমাদের অবহিত করেননি। প্রকৃতপক্ষে এ পন্থাই বিপদমুক্ত ও সতর্কতাযুক্ত। এর বিপরীতে কিছুসংখ্যক লোক এমনও আছে, যাদের অন্তর বক্র। তারা সুস্পষ্ট আয়াত থেকে চক্ষু বন্ধ করে অস্পষ্ট আয়াত নিয়ে ঘাটাঘাটিতে লিপ্ত থাকে এবং তা থেকে নিজ মতলবের অনুকূলে অর্থ বের করে মানুষকে বিভ্রান্ত করার প্রয়াস পায়। এরূপ লোকদের সম্পর্কে কুরআন ও হাদীসে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারিত হয়েছে। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ আয়াতখানি তিলাওয়াত করে বললেন, “যখন তোমরা তাদেরকে দেখবে যারা এ সমস্ত (মুতাশাবিহ) আয়াতের পিছনে দৌড়াচ্ছে, তখন বুঝে নিবে যে, আল্লাহ এ সমস্ত লোকের কথাই পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করেছেন। তখন তাদের থেকে সাবধান থাকবে।” [বুখারী ৪৫৪৭; মুসলিম: ২৬৬৫] 

ঘ। তাহকিকসমুহঃ  


(১) مصدقا /مصدق
الصيغة: الواحد المذكر
البحث: اسم الفاعل
الباب: تفعيل
المصدر: التصديق
مادة: صدق (ص+د+ق)
الجنس: الصحيح 
المعنى: موثّق 

(২)  أنزِل
الصيغة: الواحد المذكر للغائب
البحث: الماضي المطلق المجهول
الباب: إفعال
المصدر: الإنزال
مادة: نزل (ن+ز+ل)
الجنس: الصحيح
المعنى: أوحي

(৩)      
كفروا     
الصيغة: الجمع المذكر للغائب
البحث: الماضي المطلق المعروف
الباب: نصر-ينصر
المصدر: الكفر
مادة: كفر (ك+ف+ر)
الجنس: الصحيح
المعنى: جحدوا

(৪)      
الفرقان
مصدر فرق- يفرق على وزن ’فعلان،
المادة: فرق (ف+ر+ق)
الجنس: الصحيح
المعنى: الفاصل بين الحق والباطل




Post a Comment

0 Comments