ইসলামে সুন্দর নাম রাখার গুরুত্ব : একটি পর্যালোচনা
ক. হাদিসের অনুবাদ –
উপরিউক্ত হাদিসটির অনুবাদ করা হলো-
হযরত জাবের (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (সাঃ) বলেছেন, তোমরা আমার নামে নাম রাখতে পারো কিন্তু আমার উপনামে নাম রেখো না । কেননা আমাকে বন্টন কারী হিসাবে নিয়োগ করা হয়েছে । আমি তোমাদের মাঝে (দ্বীনি ইলম ও অহী বন্টন করে থাকি) । (বুখারী ও মুসলিম )
রাবির পরিচয়-
উল্লেখিত হাদিসটির রাবি হযরত জাবের (রাঃ) যিনি মুহাম্মদ (সা.) এর একজন বিশিষ্ট সাহাবি ছিলেন। জাবের ইবনে আবদুল্লাহ আল-আনসারী হিজরী ১৫ বছর পূর্বে ইয়াসরিব (বর্তমানে মদীনা) এ জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ইয়াসরিবের এক দরিদ্র পরিবারের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তিনি খাজরাজ গোত্রের লোক ছিলেন। জাবের ইবনে আবদুল্লাহ আনসারী ৭ বছর বয়সে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন বলে জানা যায়। এছাড়াও হজ সম্পর্কিত সর্বাধিক বর্ণিত হাদিসের বর্ণনাকারী হিসাবে তিনি স্বীকৃত।
বদরের যুদ্ধে তাঁর অংশগ্রহণকে নিয়ে কিছু ইতিহাসবিদের মধ্যে বিতর্ক আছে; তবে তিনি মুহাম্মদ (সা) এর নেতৃত্বে ১৯টি যুদ্ধে (বদর সহ) যুদ্ধ করেছেন বলে জানা যায় এবং তিনি একজন বিশ্বস্ত সাহাবী ছিলেন। তিনি মক্কা বিজয়ের সময় উপস্থিত ছিলেন।
হাদীস শোনা ও সংগ্রহের প্রতি তাঁর আগ্রহ এত প্রবল ছিল যে, একটি মাত্র হাদীস শোনার জন্য মাসের পর মাস ভ্রমণ করতেন।
তিনি প্রায় ১,৫৪৭টি হাদিস বর্ণনা করেছেন (কিছু ইতিহাসবিদের মতে)। মুহাম্মদ (সা.) এর মৃত্যুর পরে তিনি মসজিদ নববী, মদিনা, মিশর এবং দামেস্কে বয়ান দিতেন। আমর ইবনে দিনার, মুজাহিদ, আতিয়া ইবনে সা'দ এবং আতা ইবনে আবী রাবাহ প্রমুখ তাবিয়ীন আলেমগণ তাঁর বক্তৃতায় অংশ নিতো। লোকেরা মুহাম্মদ (সা.) এবং তাঁর হাদীস সম্পর্কে জানার জন্য দামেস্ক ও মিশরে তাঁর চারপাশে জড়ো হত।
হাদীস ছাড়া তাফসীর ও ফিকাহ শাস্ত্রেও তাঁর অগাধ পান্ডিত্য ছিল। তাফসীর শাস্ত্রে তাঁর বর্ণনা কম পাওয়া গেলেও যা আছে তা অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য।
হযরত জাবের (রাঃ) হজ্জ আদায় করেছেন কয়েকবার। হাদীসে তাঁর দু’টি হজ্জের আলোচনা দেখা যায়। একটি বিদায় হজ্জ ও অন্য আর একটি। সরলতা মুসলমানদের উন্নতির মূল রহস্য। হযরত জাবির ছিলেন অত্যন্ত সরল ও অনাড়ম্বর।
খ. ইসলামে সুন্দর নাম রাখার গুরুত্বসহকারে হাদিসের আলোকে সুন্দর নাম- (৪টি)
ইসলামে সুন্দর ও ভালো নাম রাখার গুরুত্ব অনেক। তাই রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই অনেক বাচ্চার নাম রেখে দিয়েছেন এবং কারো অসুন্দর নাম শুনলে তা পরিবর্তন করে দিতেন।প্রতিটি মানুষের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে রয়েছে তার নাম, উপনাম কিংবা উপাধি। নাম রাখার ব্যাপারে হজরত রাসূল (সা.) শিশুর জন্মের সপ্তম দিন নবজাতকের উত্তম ও সুন্দর অর্থবোধক নাম রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।(তিরমিজি )
সুন্দর নাম রাখার তাগিদ দিয়ে রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন, কিয়ামতের দিন তোমাদের নিজ নাম ও পিতার নামে ডাকা হবে। সুতরাং তোমরা সুন্দর নাম রাখো। (আবু দাউদ)
ইসলামে নামের গুরুত্ব সম্পর্কে নিন্মোক্ত বিষয়গুলো প্রণিধানযোগ্য। যেমন-
১. আল্লাহর নির্দেশ : নাম রাখার গুরুত্ব সম্পর্কেও ইসলামে রয়েছে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তা'য়ালা বলেন, `হে জাকারিয়া, আমি (আল্লাহ) তোমাকে একপুত্রের সুসংবাদ দিচ্ছি। তার নাম হবে ইয়াহইয়া। এই নামে এর আগে আমি কারও নামকরণ করিনি। [সূরা মারিয়াম, আয়াত : ৭ (দ্বিতীয় পর্ব)]
২. সুন্দর ও অর্থবোধক নাম রাখা : সুন্দর ও অর্থবহ নাম রাখার ব্যাপারে হজরত রাসূল (সা.) গুরুত্বারোপ করেছেন। সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর সুন্দর ও অর্থবোধক নাম রাখা মাতা-পিতা ও অভিভাবকের ওপর অপরিহার্য কর্তব্য। আল্লাহ তা'য়ালার গুণবাচক নামের সঙ্গে সংযুক্ত করে এবং তার প্রিয় বান্দাদের নামে নামকরণ করা উত্তম।
৩. ইসলামের বিধান : নাম রাখা ইসলামের অন্যতম বিধান। তবে কাফের মুশরিক এবং কুখ্যাত পাপীদের নামানুসারে নাম রাখা হারাম। যেসব সাহাবীর কুৎসিত ও আপত্তিকর নাম ছিল, হজরত রাসূলে কারীম (সা.) তা পরিবর্তন করে পুনরায় সুন্দর ও যথার্থ অর্থবোধক নাম রেখে দিয়েছিলেন।
৪. নবীদের নামে নাম রাখার প্রতি উৎসাহ : হজরত রাসূলে কারীম (সা.)-এর উপাধি ও উপনাম সর্বব্যাপারে পরিব্যাপ্ত ছিল। কেননা সব ধরনের নামই ব্যক্তি বা বস্তুর ওপরে এমনকি চরিত্রের ওপরও ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। শব্দের প্রভাব রয়েছে বলেই গালিগালাজ বা কটুশব্দ অপরকে উত্তেজিত করে থাকে।
৫. পরিচয়ের মাধ্যম : নাম মানুষের পরিচয়ের মাধ্যম। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হল, বর্তমান মুসলিম সমাজ ইসলামের দৃষ্টিতে নাম রাখার এ মহান গুরুত্ব পরিহার করে দিন দিন উদাসীনতার দিকে ছুটছে।
বাংলা অনুবাদ ও উচ্চারণসহ আরবিতে ৪টি সুন্দর নামের উদাহরণ -
১। عبدالله = আবদুল্লাহ (আল্লাহর বান্দা)
২। عبد العزيز = আবদুল আজিজ (আজিজ তথা
মহা পরাক্রমশালীর বান্দা)
৩। عبد الملك = আবদুল মালিক (রাজাধিরাজের বান্দা)
৪। أحمد = আহমাদ (প্রশংসনীয় ব্যক্তি)
গ. মন্দ নাম রাখার কুফল :
মন্দ নাম মানব জীবনে করুণ পরিণতি ডেকে আনে এর একটি ঘটনা উল্লেখ রয়েছে ইমাম মালেক (রঃ) এর মুয়াত্তা নামক গ্রন্থে। হযরত ইয়াহইয়া বিন সাঈদ (রাঃ) বর্ণনা করেন, হযরত উমর বিন খাত্তাব (রাঃ) জনৈক ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার নাম কি? সে বলল, জামরাত (অগ্নিস্ফুলিঙ্গ)। তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কার ছেলে? সে উত্তর দিল, ইবনে শিহাব (অগ্নিশিখার পুত্র)। তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, তোমার বাড়ী কোথায়? সে উত্তর দিল, বাহরুন নার (অগ্নিগর্ভে)। তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, কোন অংশে? সে উত্তর দিল, বিযাতিল লাযা (শিখাময় অংশে) হযরত উমর (রাঃ) তাকে বললেন, যাও, তোমার গোত্রের লোকদের নিকট গিয়ে দেখ তারা ভস্মীভূত হয়েছে। লোকটি বলেন, তাদের কাছে এসে দেখলাম যে, সত্যিই তারা ভস্মীভূত হয়েছে।
ইহুদি, খিস্টান, হিন্দু ও বৌদ্ধদের নামে মুসলমানগণ নিজেদের সন্তান-সন্ততির নামকরণ করছে। নাম শুনে বুঝা যায় না, মানুষটি মুসলিম কি না। আবার অনেক সময় দেখা যায়, মূল নাম আরবি ও অত্যন্ত সুন্দর হলেও পিতা-মাতা তথা অভিভাবকগণ ডাক নাম এমন শব্দের রেখেছেন, যা অনেক ক্ষেত্রে অর্থহীন এবং বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুসরণ প্রমাণ করছে। যেমন- জর্জ, মাইকেল, জ্যাকার, ডলি, মলি, রতন, বিদ্যুৎ, বিউটি, বল্টু, মন্টু, নান্টু, পিন্টুব, রঞ্জন, রবি, শশী ইত্যাদি।
নাম হল একজন মানুষের পরিচয়ের অন্যতম মাধ্যম। সে জন্য সুন্দর ও অর্থবোধক নাম রাখা প্রত্যেক পিতা-মাতা কিংবা অভিভাবকগণের ওপর গুরুতর দায়িত্ব এবং কর্তব্য।
বাংলা অনুবাদ ও উচ্চারণসহ আরবিতে ৪টি মন্দ নামের উদাহরণ –
১। شاه جهان = শাহজাহান (বাদশাহদের বাদশাহ)
২। عَاصِيَةُ = আছিয়া (নাফরমান, অবাধ্যচারিনী)
৩। برة = বাররাহ (পুণ্যবতী)
৪। عبد المسيح = আব্দুল মসিহ (মসিহ-র দাস)
ঘ। لاَ تَكَنَّوْا بِكُنْيَتِي এর ব্যাখ্যা –
কুনিয়াত এর শাব্দিক অর্থ হলো—উপনাম অথবা ডাকনাম। কুনিয়াত এর পারিভাষিক অর্থ হল ব্যক্তি বাচক আরবি নাম। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের
لاَ تَكَنَّوْا بِكُنْيَتِي এর অর্থ আমার উপনামে নাম রেখো না।
প্রতিটি মানুষের একটি নাম থাকে, যাকে আমরা বলতে পারি আসল বা প্রকৃত নাম। ঐ আসল নামের সাথে আরও দুটি জিনিসের ব্যবহারও লক্ষ করা যায়, যার একটিকে “কুনিয়াত” বা উপনাম এবং দ্বিতীয়টি হল; “লাকাব’’ বা উপাধি। মানুষের আসল নামের সাথে সাথে এই দুটি নামের ব্যবহারও মানুষের সৃষ্টি লগ্ন থেকেই দেখা যায়। যেমন আদম আলাইহিস সালামের উপনাম ছিল “আবুল বাশার” ইবরাহিম আলাইহিস সালামের উপনাম ছিল “আবুল আম্বিয়া” এবং উপাধি ছিল “খালীলুল্লাহ”। মূসা আলাইহিস সালামের উপাধি ছিল “কালীমুল্লাহ” ইসমাঈল আলাইহিস সালামের উপাধি ছিল “যাবীহুল্লাহ” ।
ঈসা আলাইহিস সালামের উপাধি ছিল “আল-মাসীহ। আর আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপনাম ছিল “আবুল কাশেম” এবং উপাধিও ছিল অনেক, যেমন; নবুওয়তের পূর্বে তাঁর উপাধি ছিল, আল-আমীন বা “আস্ সাদেক্বুল আমীন”। নবুওয়তের পরে “আহমাদ, আল-মুসত্বফা, আল-বাশীরুন নাযীর, সিরাজুল মুনীর।
কুনিয়াত ও ইসমের মধ্যে পার্থক্য :
• শাব্দিক পার্থক্য : কুনিয়াত অর্থ উপনাম প্ৰক্ষান্তরে ইসম অর্থ নাম।
• ব্যবহারিক পার্থক্য : ব্যবহারিক দিক থেকে কোন ব্যক্তিকে অপরাপর মানুষ থেকে পার্থক্য করার জন্য যে বিশেষ শব্দের মাধ্যমে ডাকা হয় তাকে ইসম বলে। যেমন, আহাম্মদ সুলাইমান ইত্যাদি। প্রক্ষান্তরে, কুনিয়াত হল, ছেলে বা মেয়েকে পিতা মাতার দিকে সম্পর্কিত করে কোনো উপনাম গ্রহন করা, যা দ্বারা সে প্রসিদ্ধি লাভ করে।
রাসূল (সা.) এর কুনিয়াতে কুনিয়াত রাখার হুকুম :
সাধারণভাবে যেকোনো অর্থবহ সুন্দর নাম ও উপনাম গ্রহণে কোনো বিধি-নিষেধ নেই। তবে মহানবী (সা.)-এর নাম ও উপনাম গ্রহণের ক্ষেত্রে কিছুটা বিধি-নিষেধ রয়েছে। কোনো কোনো ইমাম বলেছেন, একই ব্যক্তি ‘মুহাম্মদ’ নাম ও ‘আবুল কাসেম’ উপনাম গ্রহণ করতে পারবে না। কেননা এতে মহানবী (সা.)-এর সঙ্গে সাদৃশ্য তৈরি হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমরা আমার নামে নাম রেখো, কিন্তু আমার উপনাম গ্রহণ কোরো না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৫৩৮)।
তবে অন্যরা বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নিষেধাজ্ঞা ছিল তাঁর জীবনকালের জন্য। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর কোনো ব্যক্তি চাইলে মহানবী (সা.)-এর নাম ও উপনাম গ্রহণ করতে পারবে। কেননা আলী (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, আপনার ইন্তেকালের পর আমার যদি কোনো পুত্রসন্তান জন্মগ্রহণ করে তাহলে আমি কি তার নাম ও উপনাম আপনার নাম ও উপনামে রাখব? তিনি বলেন, হ্যাঁ।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৬৭)
উভয় মতামতের ভেতর সমন্বয় সাধনের জন্য বিজ্ঞ আলেমরা বলেন, এক ব্যক্তির জন্য নবীজি (সা.)-এর নাম ও উপনাম উভয়টি ধারণ করা অনুচিত; বরং ব্যক্তি নাম বা উপনামের যেকোনো একটি গ্রহণ করবে। ইমাম মুহাম্মদ (র.) এর মতে, একত্র কারো নাম মুহাম্মদ ও আবুল কাশেম রাখা জায়েজ নেই। তবে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে রাখলে জায়েজ।


0 Comments