মানব জীবনে সফলতা : প্রসঙ্গ তাকওয়া

 

                                                     মানব জীবনে সফলতা : প্রসঙ্গ তাকওয়া 


ক. নির্দেশনায় উদ্ধৃত আয়াত গুলোর বঙ্গানুবাদঃ

১ নং আয়াত এর বঙ্গানুবাদ


الٓـمّٓ  এর অনুবাদ দাড়ায়-  আলিফ লাল মীম।


১ নং আয়াতের ব্যাখ্যা : আলিফ, লাম, মীম এ হরফগুলোকে কুরআনের পরিভাষায় ‘হরফে মুকাত্তা'আত' বলা হয়। উনত্রিশটি সূরার প্রারম্ভে এ ধরনের হরফে মুকাত্তা’আত ব্যবহার করা হয়েছে। এগুলোর সংখ্যা ১৪টি। কি অর্থে এবং এসব আয়াত বর্ণনার কি রহস্য রয়েছে এ ব্যাপারে মুফাসসিরগণের মধ্যে বিভিন্ন মত রয়েছে। এক্ষেত্রে সর্বমোট প্রসিদ্ধ অভিমত হচ্ছে চারটিঃ 

১) এগুলোর কোন অর্থ নেই, কেবলমাত্র আরবী বর্ণমালার হরফ হিসেবে এগুলো পরিচিত। 

২) এগুলোর অর্থ আছে কিনা তা আল্লাহই ভাল জানেন, আমরা এগুলোর অর্থ সম্পর্কে কিছুই জানিনা। আমরা শুধুমাত্র তিলাওয়াত করবো। 

৩) এগুলোর নির্দিষ্ট অর্থ রয়েছে, কারণ কুরআনের কোন বিষয় বা কোন আয়াত বা শব্দ অর্থহীনভাবে নাযিল করা হয়নি। কিন্তু এগুলোর অর্থ শুধুমাত্র আল্লাহ তা'আলাই জানেন। অন্য কেউ এ আয়াতসমূহের অর্থ জানেনা, যদি কেউ এর কোন অর্থ নিয়ে থাকে তবে তা সম্পূর্ণভাবে ভুল হবে। আমরা শুধু এতটুকু বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ্ তা'আলা তার কুরআনের কোন অংশ অনর্থক নাযিল করেননি। 

৪) এগুলো মুতাশাবিহাত বা অস্পষ্ট বিষয়াদির অন্তর্ভুক্ত। এ হিসাবে অধিকাংশ সাহাবী, এমনি রহস্যপূর্ণ যার প্রকৃত মর্ম ও মাহাত্ম্য একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলাই জানেন।

২ নং আয়াত এর বঙ্গানুবাদ

ذَٰلِكَ الْكِتَابُ لَا رَيْبَ ۛ فِيهِ ۛ هُدًى لِلْمُتَّقِينَ  এর অনুবাদ দাড়ায়-  এই সেই কিতাব, যাতে কোন সন্দেহ নেই, মুত্তাকিদের জন্য হিদায়াত। 

২ নং আয়াতের ব্যাখ্যা :এ আয়াতের বর্ণনায় মুফাসসিরগণ বিভিন্ন মত পোষন করেছেনঃ 
১) এতে কোন সন্দেহ নেই যে, এ কুরআন আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিল করা হয়েছে। 
২) তোমরা এ কুরআনের মধ্যে কোন সন্দেহ করো না। [ইবনে কাসীর] 
৩) কোন কোন মুফাসসির বলেনঃ এর অর্থ তোমরা এ কুরআনের মধ্যে কোন সন্দেহে নিপতিত হবে না। অর্থাৎ এর সবকিছু স্পষ্ট। 
৪) কোন কোন মুফাসসির বলেনঃ যদি কিতাব দ্বারা ঐ কিতাব উদ্দেশ্য হয়, যাতে আল্লাহ্ তা'আলা সবকিছুর ভালমন্দ হওয়া লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন, এতে কোন পরিবর্তন, পরিবর্ধন নেই। 

৩ নং আয়াত এর বঙ্গানুবাদ

الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ وَيُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنْفِقُونَ এর অনুবাদ দাড়ায়-  গায়েবের প্রতি ঈমান আনে, সালাত কায়েম করে এবং আমি তাদেরকে যে রিযিক দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে।
৩ নং আয়াতের ব্যাখ্যা : 
আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ্‌ রাব্বুল আলামীন মুত্তাকিদের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন তারাই মুত্তাকি যারা গায়েব বা অদৃশ্যে বিশ্বাস করে, সালাত কায়েম করে এবং আমি (আল্লাহ্‌ ) যে ধন-সম্পদ তাদের দান করেছি, তা থেকে সৎ পথে খরচ করে। অদৃশ্য বা গায়েব বলতে সাধারণত মানবীয় জ্ঞান-বুদ্ধিতে যে সমস্ত বিষয় বোধগম্য হয় না, সেগুলোই বুঝানো হয়েছে। অদৃশ্য বিষয়াবলির মধ্যে স্বয়ং আল্লাহ্‌ , তাঁর ফেরেশতা, জান্নাত, জাহান্নাম, আরশ, কুরসী, লাওহ্, কলম, কিয়ামত, পুলসিরাত ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত। এ সকল গায়েবের ওপর বিশ্বাস করা ও ঈমান আনা মুত্তাকিদের প্রথম বৈশিষ্ট্য। সালাত হল ঈমানের পর আল্লাহ্‌র সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদাত। আল্লাহ্‌ প্রদত্ত জীবিকা থেকে সৎপথে ব্যয় করা হল মুত্তাকিদের দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য বা গুণ।এ আয়াত দ্বারা যাকাত দেওয়াকে বাধ্যতামূলক করা হলেও এখানে শুধু যাকাতের কথাই বলা হয়নি বরং ধন-সম্পদসহ মানব জাতিকে আল্লাহ্‌ অন্য যত কিছু দান করেছেন তার সবই এই হুকুমের অন্তর্ভুক্ত।

৪ নং আয়াত এর বঙ্গানুবাদ
وَ الَّذِیۡنَ یُؤۡمِنُوۡنَ بِمَاۤ اُنۡزِلَ اِلَیۡکَ وَ مَاۤ اُنۡزِلَ مِنۡ قَبۡلِکَ ۚ وَ بِالۡاٰخِرَۃِ هُمۡ یُوۡقِنُوۡنَ     এর অনুবাদ দাড়ায়-  আর যারা ঈমান আনে তাতে, যা তোমার প্রতি নাযিল করা হয়েছে এবং যা তোমার পূর্বে নাযিল করা হয়েছে। আর আখিরাতের প্রতি তারা ইয়াকীন রাখে।

৪ নং আয়াতের ব্যাখ্যা :  
এ আয়াতে মুত্তাকিদের চতুর্থ বৈশিষ্ট্যের কথা আলোচনা করা হয়েছে। অর্থাৎ ঐ সকল লোক মুত্তাকিদের অন্তর্ভুক্ত যারা মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স)-এর ওপর নাযিলকৃত আল-কুরআনকে আল্লাহ্‌র বাণী তথা আসমানী কিতাব বলে স্বীকার করে। মহানবী (স)-এর পূর্বে অন্যান্য নবীদের উপর প্রেরিত আসমানি গ্রন্থ যথা- তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিল ইত্যাদিকেও আসমানি কিতাব হিসেবে বিশ্বাস করে। অতএব, যারা আল-কুরআনকে আল্লাহ্‌র কিতাব বলে স্বীকার করে কিন্তু তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিলকে আল্লাহ্‌র কিতাব বলে স্বীকার করে না তারা মুমিন নয়। তবে একথা সত্য যে, মহাগ্রন্থ আল-কুরআন ব্যতীত অন্যান্য আসমানি গ্রন্থসমূহের শিক্ষা ও হুকুম-আহকামের অধিকাংশই বিলুপ্ত ও বিকৃত করা হয়েছে। মুত্তাকিদের পঞ্চম বৈশিষ্ট্য হল, আখিরাতের ওপর ঈমান আনা। আখিরাতের ওপর ঈমান আনার অর্থ হল নির্ধারিত কতকগুলো বিষয়ের ওপর দ্বিধাহীনভাবে বিশ্বাস করা।

৫ নং আয়াত এর বঙ্গানুবাদ
 اُولٰٓئِکَ عَلٰی هُدًی مِّنۡ رَّبِّهِمۡ ٭ وَ اُولٰٓئِکَ هُمُ الۡمُفۡلِحُوۡنَ  এর অনুবাদ দাড়ায়-  তারা তাদের রবের পক্ষ থেকে হিদায়াতের উপর রয়েছে এবং তারাই সফলকাম।

৫ নং আয়াতের ব্যাখ্যা :   

যারা মুত্তাকি তারাই সফলকাম। এখানে মুত্তাকিদের গুণাগুণ বর্ণনা করার পরে হিদায়াতের জন্য তাদেরকে সুনির্দিষ্ট করে বলা হয়েছে যে, তারাই তাদের রব-এর দেয়া হিদায়াত পাবে এবং তারাই সফলকাম হবে। আল্লাহর এ ঘোষণার প্রেক্ষিতে সৎলোকেরা জান্নাতে স্থান পাবে। বর্তমান জীবনের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও অসমৃদ্ধি, সাফল্য ও ব্যর্থতা আসল মানদণ্ড নয়। বরং আল্লাহর শেষ বিচারে যে ব্যক্তি উত্‌রে যাবে, সে-ই হচ্ছে সফলকাম। আর সেখানে যে উতরোবে না, সে ব্যর্থ।

খ। মুত্তাকির পরিচয় ও বৈশিষ্ট্যঃ

মুত্তাকি শব্দের অর্থ আল্লাহভীরু। মুত্তাকি শব্দটি এসেছে 'তাকওয়া' শব্দ থেকে। তাকওয়া শব্দের অর্থ হচ্ছে খোদাভীতি তথা গোনাহ থেকে আত্মরক্ষা করা। অর্থাৎ, যিনি আল্লাহকে ভয় করতঃ সকল প্রকার খারাপ কাজ হতে নিজেকে বিরত রাখেন, তাঁকে মুত্তাকি বলা হয়।মুত্তাকি ব্যক্তি সততা, আমানতদারি, সহনশীলতা, কৃতজ্ঞতা, ন্যায় ও ইসলামের গুণে গুণান্বিত হয়ে থাকে।হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, যে ব্যক্তি নিজেকে শিরক, কবিরা গুনাহ এবং অশ্লীল কথা ও কাজ থেকে মুক্ত রাখে তাকে মুত্তাকি বলা হয়।

কুরআন হলো মানুষের জন্য হিদায়াত বা পথপ্রদর্শক। কিন্তু সবাই এই কুরআন থেকে হিদায়াত পাবে না। হিদায়াত পাবেন তারাই যারা তাকওয়া অবলম্বনকারী, তথা মুত্তাকি, ‘হুদাল্লিল মুত্তাকিন অর্থাৎ এই কুরআন হলো হিদায়াত মুত্তাকির জন্য।’ আর মুত্তাকি হলো তারা ‘যারা অদৃশ্যে ঈমান আনে, নামাজ কায়েম করে এবং তাদের যে জীবনোপকরণ দান করেছি তা থেকে ব্যয় করে, আর তোমার প্রতি যে কিতাব নাজিল করা হয়েছে এবং তোমার আগে যা নাজিল করা হয়েছিল, তার ওপর ঈমান আনে এবং আখেরাতের ওপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখে, তারাই তাদের প্রতিপালকের নির্দেশিত পথে রয়েছে এবং তারাই সফলকাম। 

মহান আল্লাহ্‌ ঘোষণা করছেন যে- যারা মুত্তাকির গুণ-বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হবে, তারা তাদের প্রতিপালক মহান আল্লাহ্‌র পছন্দনীয় ও প্রদর্শিত পথে রয়েছে। সত্যিকার অর্থে তারাই দুনিয়া ও আখিরাতের শান্তি, মুক্তি ও সাফল্য লাভ করবে।তিনি মুত্তাকিগণের ছয়টি বৈশিষ্ট্যের কথাও বলে দিয়েছেন।

(১) অদৃশ্য, দৃষ্টির অন্তরালের বস্তু, যা ইন্দ্রিয়ানুভূতির অতীত, যেমন আল্লাহ, ফেরেশতা, আখেরাত, জান্নাত, জাহান্নাম ইত্যাদি ঈমান আনা বা বিশ্বাস স্থাপন করা। 
(২) যথাযথ ভাবে যথা নিয়মে, যথা সময়ে সব শর্ত পালন করে একাগ্রতা ও নিষ্ঠার সাথে সালাত সম্পাদন ও প্রতিষ্ঠা করা। 
(৩) আল্লাহ্‌ প্রদত্ত জীবিকা হতে আল্লাহ্‌র পথে ব্যয় অর্থাৎ আর্থিক ত্যাগ স্বীকার করে মানব কল্যাণে আল্লাহতায়ালার পথে ব্যয় করার মানসিকতাসম্পন্ন হওয়া। 
(৪)হযরত মুহাম্মদ (স)-এর প্রতি অবতীর্ণ আল-কুরআনকে আল্লাহ্‌র প্রদত্ত জীবন বিধান হিসেবে বিশ্বাস করা ।  
(৫)পূর্ববর্তী বিভিন্ন নবীর প্রতি যে সকল আসমানী গ্রন্থ অবতীর্ণ হয়েছে, সে সকলকে সত্য বলে স্বীকার করা ।  
(৬)আখিরাত বা পারলৌকিক জীবন সম্পর্কে দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করা।

এ সমস্ত গুণ-বৈশিষ্ট্য যাদের মধ্যে রয়েছে, মহান আল্লাহ্‌ স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, তারাই আল্লাহ্‌র পক্ষ হতে প্রদর্শিত সহজ-সরল-সঠিক পথে রয়েছে। তারাই দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতা লাভ করবে।

গ। শান্তিময় সমাজ গঠনে তাকওয়ার গুরুত্বঃ (৪টি) 

মানুষের অন্যতম মৌলিক বৈশিষ্ট্য স্বার্থপরতা। যে বিষয়ে তার নগদ স্বার্থ দেখে না তাতে সে সহসা আকর্ষণ বোধ করে না। আধুনিক বৈষয়িক মানুষের জন্য তা আরো বেশি সত্য। তবে যার মধ্যে তাকওয়া রয়েছে সে এইসবে আকর্ষণ বোধ করেনা । নিচে তাকওয়ার গুরুত্ব দেওয়া হল -

১) ভোগ-বিলাসের উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপে তাকওয়া 

আমরা জানি মাত্রাতিরিক্ত ভোগ-লিপ্সা থেকেই সমস্ত অপরাধ জন্ম লাভ করে। সবাই বুঝছি, মানছি দুর্নীতি আমাদের সমাজটা ধ্বংস করে দিচ্ছে। যার শক্তি আছে, ক্ষমতা আছে সেই তার থেকে দুর্বলের অধিকার হরণ করছে। নারী নির্যাতন ও তার ইজ্জত হরণ সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে বা নারী অধিকারের বিষয়ে আলোচনা, কঠোর আইন দিবস পালন কিছুই কাজে আসছে না।আলোচনা সভা বা দিবস পালনে মানুষের স্বভাব পরিবর্তন বা উন্নত হয় না। কোনো দিন হয়ওনি।
আল্লাহ বলেন,

‘‘নিশ্চয়ই মুত্তাকিদের (তাকওয়ার অধিকারীদের) জন্য আছে সাফল্য।’’ (নাবা ৭৮: ৩১)।

আরো বলেন-
পক্ষান্তরে যে নিজ প্রতিপালকের সম্মুখে উপস্থিত হওয়ার ভয় রাখে এবং প্রবৃত্তি হতে নিজেকে বিরত রাখে, জান্নাতই হবে তার বাসস্থান। (নাযিয়াত ৭৯: ৪০-৪১)।

এহেন তাকওয়াবান মানুষ সাধারণভাবে দুর্নীতিতে লিপ্ত হয় না। অপরের অধিকার বিনষ্ট করে না। তার জন্য বৈধ নয়- এমন নারীকে কামনা করা তো দূরের কথা, সে কথা মনে করতেও ঘৃনা করে।একটা সুন্দর সমাজের জন্য এহেন পবিত্র চরিত্রের নারী-পুরুষ আমাদের প্রয়োজন। তাই সুন্দর ও কল্যাণময় সমাজ গঠনে তাকওয়ার বিকল্প নেই।

২) মিথ্যাচার বর্জনে তাকওয়া

সুদ, ঘুষ, মাপে-ওজনে কম দেওয়াসহ সব ধরনের হারামের উৎপত্তি মিথ্যার উপর। এজন্য বলা হয় মিথ্যা সকল পাপের মা।সমাজের দায়িত্বশীল মহল থেকে অধীনস্থ ও সাধারণ মানুষদের বিভ্রান্ত করার জন্য মিথ্যার আশ্রয় নেওয়া হয়।আদালতে বিচারককে বিভ্রান্ত করার জন্য দেয়া হয় মিথ্যা সাক্ষ্য অথবা দুর্নীতিগ্রস্ত বিচারক অর্থের বিনিময়ে যে ভুল রায় দিচ্ছেন তার ভিত্তি মিথ্যা।রাষ্ট্রীয় সম্পদ তসরুফ করা, ক্লাসে না পড়িয়ে শিক্ষকরা যখন কোচিং বাণিজ্য করেন কিংবা সাংবাদিকরা যখন হলুদ সাংবাদিকতার আশ্রয় নেন- এসব কিছুর মূলেই রয়েছে মিথ্যা।

এসবই অন্যায়-অপরাধ, সবাই জানি মানি, অন্তত নিজেরা যখন আক্রান্ত হই, তখন তো সবাই এসবের ক্ষতিকারকতা বুঝি। তবুও কেন এমন হচ্ছে? তাকওয়ার অভাব বা অনুপস্থিতি এর জন্য দায়ী। আর তাকওয়া অর্জনের উদ্দেশ্য ছাড়া আমরা যে রোজা রাখছি, তা আমাদের মাঝে সমাজ সংশোধনের অপরিহার্য এই গুণ সৃষ্টি করতে পারছে না।তাই নিজেদের দুনিয়া ও আখিরাতের স্বার্থেই আমাদের তাকওয়ার চর্চা বাড়াতে হবে। তাকওয়াভিত্তিক জীবন গঠনে অগ্রসর হয়ে আসতে হবে। অন্যথায় মহান আল্লাহতা’লার সিদ্ধান্ত হলো-

‘‘অতঃপর যে সীমা লংঘন করে এবং পার্থিব জীবনকে প্রাধান্য দেয় নিশ্চয়ই জাহান্নামই হবে তার আবাসস্থল।’’ (নাযিয়াত ৭৯: ৩৭-৩৯)।

৩. সঠিক ও ভারসাম্যপূর্ণ জ্ঞানের জন্য তাকওয়া 

দুনিয়ার জীবনের যাবতীয় কাজে সঠিক দিক-নির্দেশনা ও সিদ্ধান্ত অপরিহার্য। কিন্তু মানুষের তৈরি ধ্যান-ধারণা ও মতবাদ তা দিতে চরমভাবে ব্যর্থ।মানুষ নিজের জন্য ভারসাম্যপূর্ণ ও সকলের অধিকার নিশ্চিত করে এমন বিধান রক্ষায় বরাবর ব্যর্থ হয়েছে, ব্যর্থ হচ্ছে। 

মানবচরিত্রের দুটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য এর জন্য দায়ী।

প্রথমত মানুষ স্বভাবতই স্বার্থপর। সে কোনো কর্তৃত্ব, অধিকার পেলেই নিজের, নিজের পরিবারের, গোষ্ঠী অথবা জাতির অনুকূলে স্বজনপ্রিয়তায় লিপ্ত হয়। অন্যের অধিকার নষ্ট করে; তাকে ধ্বংস করে হলেও সে নিজের ও স্বজনের অবৈধ স্বার্থ হাসিল করতে চায়। দ্বিতীয়ত মানুষের জ্ঞানগত সীমাবদ্ধতা। 
মানুষকে দুনিয়ায় প্রেরণের সময় তাকে প্রয়োজনমতো হেদায়াত, নিয়ম-নীতি ও বিধান প্রেরণের জন্য আল্লাহ তা’য়ালা ওয়াদা করেছেন। (বাকারা ২: ৩৮)।

মহান আল্লাহ তা’য়ালা তাঁর ওয়াদা মাফিক নবী-রাসূলদের মাধ্যমে যুগে যুগে এই হেদায়েত প্রেরণ করেছেন। সর্বশেষ হেদায়াত আল-কুরআন নাযিল করেছেন শেষ নবী মুহাম্মদ (সা.) এর নিকট। তবে সেই হেদায়াত থেকে উপকৃত হওয়ার জন্য তাকওয়ার অধিকারী হতে হবে।

‘‘ইহাই সেই কিতাব, এতে কোনোই সন্দেহ নেই। মুত্তাকিদের (তাকওয়াধারীদের) জন্য এটা হেদায়েত।’’ (বাকারা ২:২)। 

দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতার জন্য আল-কুরআন থেকে হেদায়াত লাভ করা অপরিহার্য। কিন্তু কোনো অসংযমী, অপরের অধিকার হরণকারী, মিথ্যাচারী বা কপট ব্যক্তি কুরআন থেকে হেদায়াত লাভ করবে না। তাই কুরআনী হেদায়াতের আলোতে জীবনকে সুন্দর করার জন্য তাকওয়া অর্জনে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেই সকলে।

৪. সত্য-মিথ্যা ও ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্যকারী জ্ঞান লাভে তাকওয়া

মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেন- ‘‘হে মুমিনগণ! যদি তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করে চল তবে আল্লাহ তোমাদেরকে ফুরকান দান করবেন।’’ (আনফাল ৮: ২৯)।

ফুরকান হলো সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায়, সভ্যতা-অসভ্যতার পার্থক্যকারী জ্ঞান। আল-কুরআনের অপর নাম আল-ফুরকান।
আল-কুরআনে মানবজাতির জন্য আছে ফুরকান। (বাকারা ২: ১৮৫)।
মানবজীবন দ্বন্দ্বমুখর। (বালাদ ৯০: ৪)। 

আভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক নানা টানাপোড়েনে অবিরাম আক্রান্ত হই আমরা। অধিকার চায় এখানে সবাই। দায়িত্বে আগ্রহী নয় কেউই। কোথায় কতটুকু কার অধিকার, কিভাবেই বা তা আদায় করা যাবে সে জ্ঞান ছাড়া সুষ্ঠু-সুন্দর-ভারসাম্যপূর্ণ জীবন ও সমাজ কল্পনা করা যায় না।

আল্লাহ জানিয়ে দিয়েছেন তাকওয়া অবলম্বন করে চললে সেই জ্ঞান তিনি তার বান্দাদের দান করবেন। তাই ন্যায় ও সত্যভিত্তিক সুসভ্য সমাজ গড়ার জন্য আমাদের জীবনে তাকওয়া অপরিহার্য।

ঘ। তাহকিক 

১ম শব্দ   یُؤۡمِنُوۡنَ  (ইউ’মিনুনা)


২য় শব্দ رَزَقۡنٰهُمۡ    (রাজাক’না হুম)



৩য় শব্দ اُنۡزِلَ   ( উংজিলা)


৪র্থ শব্দ مُفۡلِحُوۡنَ  ( মুফ লিহুন)




Post a Comment

0 Comments