স্বাস্থ্য সুরক্ষায় হাঁচি ও হাই তোলার ইসলামি বিধান : একটি পর্যালোচনা

 


স্বাস্থ্য সুরক্ষায় হাঁচি ও হাই তোলার ইসলামি বিধান : একটি পর্যালোচনা

ক. হাদিসের অনুবাদ –

উপরিউক্ত হাদিসটির অনুবাদ করা হলো-

আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ হাঁচি পছন্দ করেন কিন্তু হাই তোলা অপছন্দ করেন। অতএব কোন ব্যক্তি হাঁচি দেয়ার পর আল্লাহর প্রশংসা করলে এবং যে কোন মুসলিম তা শোনতে পেলে হাঁচির জবাব দেয়া তার কর্তব্য। আর হাই উঠে শয়তানের পক্ষ থেকে। অতএব কেউ তা যেন যথাসাধ্য প্রতিহত করে। কোন ব্যক্তি হাই তুলে ‘হা’ (মুখ গহব্বর ফাঁক) করলে তাতে শয়তান (আনন্দে) অট্টহাসি দেয়। (বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী, আবু দাউদ, নাসাঈ, আহমাদ, হাকিম, ইবনে হিব্বান, ইবনে খুজাইমাহ)

রাবির পরিচয়-
উল্লেখিত হাদিসটির রাবি হযরত আবু হুরায়রা ( রাঃ)। আবু হুরায়রা (রাঃ) ৫৯৯ সালে ইয়েমেনে জন্ম গ্রহণ করেন।আবু হুরায়রার ইসলাম গ্রহণের আগে নাম ছিলো আবদুশ শামস্।ইসলাম গ্রহণের পরে মুহাম্মদ( সাঃ) তার নাম পরিবর্তন করে রাখেন আবদুর রাহমান। ছোট বেলায় তিনি একটি বিড়াল শাবকের সাথে তিনি সবসময় খেলতেন। তা দেখে তার বন্ধুরা তার নাম দেন আবু হুরাইরা (বিড়াল শাবকওয়ালা)। আস্তে আস্তে এ নামেই তিনি সকলের মাঝে পরিচিত হন এবং তার আসল নামটি অপ্রচলিত হয়ে পড়ে।তিনি আসহাবুস সুফফার একজন সদস্য ছিলেন এবং একনিষ্ঠ জ্ঞান পিপাসু ছিলেন। 

আবু হুরাইরাহ নিজে জ্ঞান অর্জন করতে ও জ্ঞান বিতরণ করতে ভালোবাসতেন। এইজন্য তিনি সবসময়  মুহাম্মদ (সাঃ)থেকে তার মুখ নিসৃত কথা শুনতেন। মুহাম্মদ (সাঃ) থেকে এত বেশি হাদীস বর্ণনার ব্যাপারটি অনেকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখতো। তাই তিনি বলেছিলেন, ‘তোমরা হয়তো মনে করছো আমি খুব বেশি হাদিস বর্ণনা করি। কিন্তু আমি ছিলাম রিক্তহস্ত, দরিদ্র, পেটে পাথর বেঁধে সর্বদা মুহাম্মাদের সাহচর্যে কাটাতাম। আর মুহাজিররা ব্যস্ত থাকতো তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যে এবং আনসাররা তাদের ধন-সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণে।
তিনি আরও বলেন, ‘‘একদিন আমি বললাম, ‘ইয়া মুহাম্মাদ (সাঃ) আমি আপনার অনেক কথাই শুনি, কিন্তু তার অনেক কিছুই ভুলে যাই।’ একথা শুনে মুহাম্মাদ(সাঃ) বললেন, ‘তোমার চাদরটি মেলে ধরে বুকের সাথে লেপ্টে ধর। এরপর থেকে আর কোন কথাই আমি ভুলে যাইনি।

খ. عطس ও تثاؤب  শব্দ দুটির পরিচয় ও আদব 





عطس ও تثاؤب  শব্দ দুটির আদব (হাঁচি দেয়া ও হাই তোলার আদব)

 ১. হাঁচি দেয়ার সময় উভয় হাত অথবা কাপড় দ্বারা মুখমন্ডল ঢেকে রাখার চেষ্টা করা,যাতে কোন ময়লা অপরের গায়ে পড়ার আশঙ্কা না থাকে। 

২. হাঁচি দিয়ে আলহামদুলিল্লাহ বলার মাধ্যমে আল্লাহ তালার নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা।আলহামদুলিল্লাহ শ্রবণান্তে উক্ত হাঁচির উত্তরদাতা ইয়ারহামুকাল্লাহ বলবে তখন হাঁচিদাতা পুনরায় ‘ইয়াহদীকুমুল্লাহ ওয়া ইউসলিহু বা-লাকুম’ বলবে।’ 

৩. হাঁচি আসলে মুখ ঢাকার এবং আওয়াজ ক্ষীণ করার কথা বলা হয়েছে। 

৪.হাই আসলে যথাসম্ভব তা প্রতিহত করা।রাসুল (সাঃ) বলেন, ‘‘নিশ্চয় আল্লাহ হাঁচিকে পছন্দ এবং হাইকে অপছন্দ করেন।”

* হাই তোলা একান্তই প্রয়োজন হলে হাই তোলার পর বলতে হবে," লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ্" পড়া। 

গ. হাঁচি দেয়া ও হাই তোলার বিধান ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা

ইসলামের প্রতিটি আদর্শ-সুন্নত মানুষের কোনো না কোনো উপকার-কল্যাণসাধন করে থাকে এবং প্রতিটি কাজ ও আমলেই নিহিত রয়েছে বহু যৌক্তিকতা ও সৌন্দর্য। কোভিড মহামারী বর্তমানে পৃথিবীর স্বাভাবিক গতিকে থমকে দিয়েছে। কোভিড ১৯ পৃথিবীর স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় সুচিত করেছে নতুন নিয়ম নীতির। হাঁচি -কাশি দেয়ার সময় ট্যিসু বা রুমাল ব্যবহার করা,মাস্ক ব্যবহার,দূরত্ব বজায় রেখা চলাফেরা করা ইত্যাদি। হাঁচির বিষয়টি লক্ষ্য করলে আমরা দেখতে পাই রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আদবের সাথে সামঞ্জস্যতা।ইসলাম কতোটা আধুনিক এবং বৈজ্ঞানিক তা তখনই আরো বেশি উপলব্ধি করা যায় যখন পৃথিবী বিভিন্ন মহামারী অথবা কোন একটা কঠিন সমস্যার সম্মুখীন হয়।কেননা ইসলাম এতটাই সমৃদ্ধ, যাতে রয়েছে সবকিছুরই সহজ সমাধান।
হাঁচিদ্বারা মানুষের দেহের ভিতরের দূষিত পদার্থ বের হয়ে আসে এবং মুখ খোলা থাকলে সে দূষিত পদার্থ বাতাসের মাধ্যমে অন্যের মধ্যে সংক্রমিত হতে পারে। এ আশঙ্কা হতে নিরাপদে থাকার জন্য খোদ রসূলুল্লাহ (সা.) হাঁচি এলে তার পবিত্র হাতদ্বারা মুখ বন্ধ রাখতেন কিংবা কাপড়দ্বারা ঢেকে রাখতেন এবং মৃদু স্বরে কথা বলতেন। মনে রাখতে হবে, রসূলুল্লাহ (সা.) এর পবিত্র হাঁচি দূষিত ও বিষাক্ত পদার্থ হতে মুক্ত ছিল। কিন্তু তিনি উম্মতের শিক্ষার জন্য উক্ত উপায় অবলম্বন করে দেখিয়ে দিয়েছেন। 

হাঁচি-কাশি ও হাই তোলার ব্যাপারে মহানবী (সা.) যে নির্দেশনা বা বিধান দিয়েছেন:

১) হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন- “যখন রাসূলুল্লাহর (সা.) হাঁচি আসতো তখন তিনি নিজের হাত বা কাপড় দ্বারা মুখ ডেকে ফেলতেন এবং হাঁচির শব্দকে নিচু রাখতেন।“ (তিরমিযী ও আবু দাউদ)

২) হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূল সা: ইরশাদ করেছেন, “যখন তোমাদের কারো হাই আসে, তখন সে যেন নিজের হাত দ্বারা মুখ বন্ধ করে রাখে। নতুবা শয়তান তার মুখের ভিতরে চলে যায়। (মুসলিম, হাদিস নং-২৯৯৫)

অর্থাৎ হাঁচি-কাশি দেয়ার সময় বিশেষভাবে লক্ষ রাখতে হবে, যেনো শ্লেষ্মা অন্য কোনো লোকের গায়ে-মুখে না পড়ে।

৩) আর কোনো বৈঠকে বসা অবস্থায় হাই আসলে তখন তাকে যেকোনো উপায়ে রোধ করতে চেষ্টা করবে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, নামাজের মধ্যে হাই তোলা শয়তানের পক্ষ থেকে হয়ে থাকে। তোমাদের কারো হাই এলে সে যেন তা ফেরানোর যথাসাধ্য চেষ্টা করে। (তিরমিজি, হাদিস : ৩৭০)


৪) হাঁচির সময় মুখে হাত অথবা কাপড় রেখে যথাসম্ভব শব্দ কম করতে বলা হয়েছে। যাতে মজলিসে আপনার হাঁচির শব্দে লোকেরা চমকে বা বিরক্ত না হয়ে যায় এবং আপনার নাক বা মুখ থেকে সবেগে নির্গত শ্লেষ্মা অথবা থুথু অপরের গায়ে গিয়ে না লাগে। আবূ হুরাইরা (রাঃ) বলেন, রাসুল (সা.) যখন হাঁচতেন, তখন নিজ হাত অথবা কাপড় দিয়ে মুখ ঢেকে নিতেন এবং শব্দ কম করতেন।হাদিসে রসুল (সা.) ইরশাদ করেন— ‘পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ইমানের অঙ্গ।’


যদি কেউ একাধিকবার হাঁচে, তাহলে ৩ বারের অধিক হাঁচলে আর উত্তর দিতে হয় না। তখন তা তার সর্দির ফলে হচ্ছে বলে জানতে হবে।নামাযে হাঁচলে নিম্নের দু‘আ পড়ুন

اَلْحَمْدُ للهِ حَمْداً كَثِيْراً طَيِّباً مُّبَارَكاً فِيْهِ مُبَارَكاً عَلَيْهِ كَمَا يُحِبُّ رَبُّنَا وَيَرْضى


ঘ. তাহকিকসমূহ










Post a Comment

0 Comments