সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠায় জিহবা সংযত করণের গুরুত্ব : একটি পর্যালোচনা
মানব জীবনে আদব বা শিষ্টাচার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠায় শিষ্টাচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিশেষ করে জিহবা সংযত করণের গুরুত্ব অপরিসীম। উত্তম চরিত্র, ভাল ব্যবহার ও সুসভ্য জাতি গঠনের সর্বোত্তম উপায় ও উপকরণ রয়েছে পবিত্র কুরআন ও হাদিসে । আহার-পানীয় গ্রহণে, অন্যের সঙ্গে কুশল বিনিময়ে, সালাম আদান-প্রদানে, অনুমতি গ্রহণে, ওঠাবসা, কথা বলা, আনন্দ ও শোক প্রকাশ প্রভৃতি ক্ষেত্রে মুমিনের আচরণ কিরূপ হবে তার সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে ইসলামে। কোন মুসলিম কাঙ্ক্ষিত মানের ও সুসভ্য মানুষ রূপে গড়ে উঠবে এবং নিজেকে অন্যান্য জাতি অপেক্ষা ভিন্ন বৈশিষ্ট্যমন্ডিত করতে সক্ষম হবে তখনই, যখন ইসলামী শিষ্টাচারের সুষমাকে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও পার্থিব জীবনের সকল দিক ও বিভাগে ফুটিয়ে তুলতে পারবে। পৃথিবীতে যত আদর্শ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তা সুন্দর কথা দিয়েই হয়েছে। অসুন্দর কথা ও খারাপ ভাষা প্রয়োগ করে কোন আদর্শ পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ভাল কথা দিয়ে সহজেই মানুষের মন জয় করা যায়। শ্রেষ্ঠ মনীষীরা সুভাষী ছিলেন। একটি সুন্দর কথা ভালো গাছের মতো, মাটিতে যার শিকড় বদ্ধমূল, আকাশে যার শাখা বিস্তৃত, যে গাছ অফুরন্ত ফল দান করে। তাই সুস্পষ্ট ভাষায় সুন্দরভাবে কথা বলতে হবে।
ক. অনর্থক কথাবার্তা (পরিচয় ও কুফল)–
আল্লাহ তায়ালা বাচনশক্তি ও ভাষার নেয়ামত দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এর ব্যবহার বিধিও আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন। বলে দিয়েছেন, কীভাবে ও কোন কথা বললে মুখ ও ভাষার সঠিক ব্যবহার হবে। আর কীভাবে বললে হবে অন্যায় ব্যবহার। কোন কাজ করলে আল্লাহ খুশি হবেন আর কোন কাজ করলে আল্লাহ শাস্তি দেবেন। কথাবার্তা বলার বিধানের একটি হলো, অনর্থক ও বেহুদা কথাবার্তা থেকে বেঁচে থাকা। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে এ ব্যাপারে অসংখ্য বর্ণনা এসেছে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমার বান্দাদের বলে দাও, তারা যেন এমন কথাই বলে, যা উত্তম। নিশ্চয় শয়তান মানুষের মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। নিশ্চয় শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু।’ (সুরা বনি ইসরাইল : ৫৩)। অন্য আয়াতে প্রকৃত মুমিনদের পরিচয় বর্ণিত হয়েছে ‘তারা অনর্থক কথা ও কাজ থেকে বিরত থাকে।’ (সুরা মুমিনুন : ৩)। আয়াতে ‘অনর্থক’ (লাগউন) শব্দ উল্লেখ হয়েছে। অর্থাৎ যেসব কথা ও কাজে কোনো ধর্মীয় উপকারিতা নেই। অনর্থক কথাবার্তায় লিপ্ত হওয়া অনেক বড় গুনাহ। এতে ধর্মীয় উপকারের বিপরীতে ক্ষতি বিদ্যমান। এ থেকে বিরত থাকা কর্তব্য।
অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তারা যখন কোনো অনর্থক কথা শোনে, তা এড়িয়ে যায় আর বলে আমাদের জন্য আমাদের কর্ম এবং তোমাদের জন্য তোমাদের কর্ম। তোমাদেরকে সালাম। আমরা অজ্ঞদের সঙ্গে জড়িত হতে চাই না।’ (সুরা কাসাস : ৫৫)
অন্যত্র ঘোষিত হয়েছে, ‘মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তার জন্য একজন প্রহরী নিযুক্ত আছে, যে (লেখার জন্য) সদাপ্রস্তুত।’ (সুরা কাফ : ১৮)
হাদিস শরিফে এসেছে, হজরত আবু হুরাইরা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি অনর্থক কাজ ও কথা থেকে বেঁচে থাকে, তার ইসলাম পূর্ণাঙ্গ ও সুন্দর।’ (ইবনে মাজাহ : ৩৯৭৬)। হজরত আবু জুহাইফা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবাদের জিজ্ঞাসা করলেন, আল্লাহর নিকট কোন আমল সবচেয়ে পছন্দনীয় তোমরা কি জানো? সবাই চুপ থাকলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) উত্তর দিলেন, সবচেয়ে পছন্দনীয় আমল হলো নিজের জবানকে হেফাজত করা।’ (বায়হাকি : ৪/২৪৫)
হজরত আনাস (রা.) বলেন, নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘বান্দা যতক্ষণ পর্যন্ত নিজের মুখকে হেফাজত না করবে ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমানের গভীরতায় পৌঁছতে পারবে না।’ (শুয়াবুল ঈমান : ৪৬৫১)
শুধু মুখের কথার কারণেই অনেক সময় মানুষকে অনেক বড় বিপদে পড়ে যেতে হয়। এ কারণে আমাদের উচিত অনর্থক কথাবার্তা ত্যাগ করা। অনর্থক কথা-কাজ মুমিনের জন্য শোভনীয় নয়। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘কোনো ব্যক্তির ইসলামের অন্যতম সৌন্দর্য হলো অর্থহীন কথা বা কাজ ত্যাগ করা।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৩১৮)
খ। মিথ্যা (পরিচয় ও কুফল)
সত্য কোন কিছু লুকানো কে মিথ্যা বলা হয়। কারও কাছে কোনো কথা শোনামাত্রই (যাচাই না করেই) তা বলে বেড়ানো মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য যথেষ্ট - আল হাদিস (মুসলিম : ৯৯৬)
মিথ্যা বলা বা সত্যের বিপরীত যে কোন কথা হল কুৎসিত এবং তা বর্জনীয়। আর এটা শয়তানের অন্যতম ধারালো অস্ত্র। মিথ্যা বলা কবীরা গুনাহ। মিথ্যাবাদী হচ্ছে মানব সমাজের বড় দুশমন।
মিথ্যাবাদীদের সম্পর্কে আল্লাহ্ বলেছেন :
إِنَّمَا يَفْتَرِي الْكَذِبَ الَّذِينَ لاَ يُؤْمِنُونَ بِآيَاتِ اللّهِ وَأُوْلـئِكَ هُمُ الْكَاذِبُونَ
‘নিশ্চয় তারাই মিথ্যা আরোপ করে যারা আল্লাহ্র নিদর্শনসমূহে বিশ্বাস করে না;এবং প্রকৃতপক্ষে তারাই হল মিথ্যাবাদী (সূরা নাহল: ১০৫)।’
মহানবী (সা.) বলেছেন : ‘কপটতার দরজাসমূহের একটি দরজা হল মিথ্যা (তানবীহ আল খাওয়াতীর,পৃ. ৯২)।’
মহানবী (সা.) আরও বলেন : ‘এটি একটি বড় বিশ্বাসঘাতকতা যে,তুমি তোমার ভাইয়ের সাথে কথা বল এবং সে তোমাকে বিশ্বাস করে,অথচ তুমি তাকে মিথ্যা বলছ (আত তারগীব,৩য় খণ্ড,পৃ. ৫৯৬)।’
মহানবী (সা.) বলেছেন : ‘মিথ্যা হতে দূরে থাক। কারণ,মিথ্যা ঈমান থেকে দূরে সরিয়ে দেয় (কানজুল উম্মাল,৩য় খণ্ড,হাদীস নং ৮২০৬)।’
মিথ্যার কুফল
১. মিথ্যা বলার ফলে সমাজে কপটতা প্রসার লাভ করে। কারণ,সকল প্রকার কপটতার উৎস হল মিথ্যাবাদিতা।
২. অন্য অনেক বড় গুনাহের উপকরণ হল মিথ্যাবাদিতা। যেমন খেয়ানত,গুজব ছড়ানো,মাপে কম দেয়া,চুক্তি ভঙ্গ করা।
৩. একটি মিথ্যা অনেক মিথ্যার জন্ম দেয়। কারণ,একটি মিথ্যাকে প্রতিষ্ঠা করতে আরও অনেক মিথ্যা কথা বলতে হয়।
৪. যারা মিথ্যা কথা বলে তারা অন্যদেরও একই রকম মিথ্যাবাদী মনে করে। ফলে সমাজে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়। এমনকি মিথ্যাবাদী নিজের ওপর থেকেও আস্থা হারিয়ে ফেলে।
৫. মিথ্যাবাদী সত্যকে গ্রহণ করার মানসিকতা হারিয়ে ফেলে।
৬. মিথ্যাবাদীর দায়িত্বজ্ঞান লোপ পায়।
৭. মিথ্যাবাদীদের সম্মান না থাকায় সে নির্লজ্জের মতো যে কোন ধরনের কাজে লিপ্ত হয়। এতে সমাজে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়।
৮. মিথ্যাবাদী তার মিথ্যা প্রকাশ হয়ে পড়ার আশংকায় সবসময় মানসিকভাবে অস্বস্তিতে ভোগে।
৯. সর্বোপরি মিথ্যাবাদী আল্লাহ্র রহমত ও হেদায়াত থেকে বঞ্চিত। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে :
إِنَّ اللَّـهَ لَا يَهْدِي مَنْ هُوَ كَاذِبٌ كَفَّارٌ
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ্ মিথ্যাবাদী কাফিরকে সৎপথে পরিচালিত করেন না (সূরা যুমার : ৩)।’
১০. মিথ্যা রিজিক ও বরকতে ঘাটতি সৃষ্টি করে। মিথ্যা সাময়িক সুবিধা ও লাভজনক মনে হলেও এর অভ্যন্তরীণ ক্ষতি অনেক বেশি। ব্যবসায়ীরা সাধারণত ব্যবসায় লাভবান হওয়ার জন্য অনেক ক্ষেত্রে মিথ্যার আশ্রয় নেয়, এতে বাহ্যত পণ্যের কাটতি বাড়লেও ব্যাবসায়িক মুনাফার বরকত কমে যায়।
১১. মিথ্যা আত্মিক প্রশান্তি দূর করে। মিথ্যা মানুষের অন্তরকে সংকুচিত করে ও সর্বদা চিন্তিত রাখে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে বিষয়ে তোমার সন্দেহ হয় তা পরিত্যাগ করো। যে বিষয়ে সন্দেহ নেই তা গ্রহণ করো। কেননা সত্য হচ্ছে প্রশান্তি আর মিথ্যা হচ্ছে সন্দেহ।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৫১৮)
গ। গিবত (পরিচয়,কুফল ও দলিলসহ হুকুম)
গিবত আরবী শব্দ। আভিধানিক অর্থ-কুৎসা, পরনিন্দা, পরচর্চা, পরোক্ষে নিন্দা ইত্যাদি। কারো অগোচরে তার পোশাক-পরিচ্ছদ, বংশ, চরিত্র, দেহাকৃতি, কর্ম, দ্বীন, চলাফেরা, ইত্যাদি যে কোনো বিষয়ে কোন দোষ অপরের কাছে প্রকাশ করা।
ইবনুল আছীর রহ. বলেছেন :গিবত হলো কোন মানুষের অগোচরে তার মন্দ বিষয় উল্লেখ করা, যদিও সে ত্রুটি তার মধ্যে বিদ্যমান থাকে।
গিবতের পরিচয় সম্পর্কে হাদীসের এক বর্ণনায় এসেছে,
“মুত্তালিব ইবনু আব্দিল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন : রাসূলুল্লাহ
বলেছেন :
ﻋﻦ ﺍﻟﻤﻄﻠﺐ ﺑﻦ ﻋﺒﺪ ﺍﻟﻠﻪ ﻗﺎﻝ : ﻗﺎﻝ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻲ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ : ﺍﻟﻐﻴﺒﺔ ﺃﻥ ﺗﺬﻛﺮ ﺍﻟﺮﺟﻞ ﺑﻤﺎ ﻓﻴﻪ ﻣﻦ ﺧﻠﻔﻪ
গিবত হলো কোনো ব্যক্তি সম্বন্ধে তার অগোচরে এমন কিছু বলা যা তার মধ্যে বিদ্যমান।”
হাদীসের অপর এক বর্ণনায় এসেছে,
ﻋَﻦْ ﺃَﺑِﻲ ﻫُﺮَﻳْﺮَﺓَ ﺃَﻥَّ ﺭَﺳُﻮﻝَ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﺻَﻠَّﻰ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻭَﺳَﻠَّﻢَ ﻗَﺎﻝَ ﺃَﺗَﺪْﺭُﻭﻥَ ﻣَﺎ ﺍﻟْﻐِﻴﺒَﺔُ ﻗَﺎﻟُﻮﺍ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﻭَﺭَﺳُﻮﻟُﻪُ ﺃَﻋْﻠَﻢُ ﻗَﺎﻝَ ﺫِﻛْﺮُﻙَ ﺃَﺧَﺎﻙَ ﺑِﻤَﺎ ﻳَﻜْﺮَﻩُ ﻗِﻴﻞَ ﺃَﻓَﺮَﺃَﻳْﺖَ ﺇِﻥْ ﻛَﺎﻥَ ﻓِﻲ ﺃَﺧِﻲ ﻣَﺎ ﺃَﻗُﻮﻝُ ﻗَﺎﻝَ ﺇِﻥْ ﻛَﺎﻥَ ﻓِﻴﻪِ ﻣَﺎ ﺗَﻘُﻮﻝُ ﻓَﻘَﺪْ ﺍﻏْﺘَﺒْﺘَﻪُ ﻭَﺇِﻥْ ﻟَﻢْ ﻳَﻜُﻦْ ﻓِﻴﻪِ ﻓَﻘَﺪْ ﺑَﻬَﺘَّﻪُ
“আবূ হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : একদা রাসূলুল্লাহ (স.) জিজ্ঞেস করলেন : তোমরা কি জান গীবত কাকে বলে? সাহাবায়েকিরাম রা. উত্তর করলেন : আল্লাহ ও তদীয় রাসূলই সম্যক জ্ঞাত। তিনি বললেন : গীবত হলো তোমার ভাই সম্পর্কে এমন কিছু বলা যা তাকে নাখোশ করবে। জানতে চাওয়া হলো : যদি আমার ভাইয়ের মধ্যে তা বিদ্যমান থাকে তাহলেও কি? তিনি জবাবে বললেন : তোমার ভাইয়ের মধ্যে যা কিছু বিদ্যমান তা বললেই গীবত হবে; অন্যথায় তুমি তাকে অপবাদ দিলে।”
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে,
ﻋَﻦْ ﺃَﺑِﻲ ﻫُﺮَﻳْﺮَﺓَ ﺃَﻥَّ ﺭَﺳُﻮﻝَ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﺻَﻠَّﻰ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻭَﺳَﻠَّﻢَ ﻗَﺎﻝَ ﺍﻟْﻐِﻴﺒَﺔُ ﺫِﻛْﺮُﻙَ ﺃَﺧَﺎﻙَ ﺑِﻤَﺎ ﻳَﻜْﺮَﻩ
আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : রাসূলুল্লাহ বলেছেন : গিবত হলো তোমার ভাই সম্বন্ধে এমন কিছু বলা যা সে অপছন্দ করে।
গিবতের কুফল-
নবী করীম (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউই কারও গিবত করবে না। গিবত করলে তোমরা ধ্বংস হবে।’ মহানবী (সা.) আরও বলেন, ‘তোমরা গিবত থেকে বেঁচে থাকো। কারণ তাতে তিনটি ক্ষতি রয়েছে-
১. গীবতকারীর দোয়া কবুল হয় না,
২. গীবতকারীর কোনো নেক আমল কবুল হয় না ও
৩. আমলনামায় তার পাপ বৃদ্ধি হতে থাকে।
মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনুল কারীমে এই গীবতের পরিণাম বুঝাতে সুরায়ে হুজুরাতের ১২ নং আয়াতে ইরশাদ করেন- ‘আর তোমরা একে অপরের গীবত করে না। তোমাদের কেউ কি এটা পছন্দ করবে যে, তার মৃত ভাইয়ের গোশত খাবে? নিশ্চয়ই তোমরা এটাকে অপছন্দ করবে। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা সীমাহীন ক্ষমাকারী এবং দয়ালু।’ এই আয়াতে মহান আল্লাহ তায়ালা কারো গীবত করাকে মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার সাথে তুলনা করেছেন। নাউজুবিল্লাহি মিন জালিক।
গিবতের ভয়াবহতা বুঝাতে গিয়ে রাসূল (সা:) বলেছেন যা মিশকাত শরীফে রয়েছে, গিবত করা যিনা থেকেও মারাত্মক গুনাহ। সাহাবায়ে কেরামগণ রাসূলে কারীম (সা:) কে জিজ্ঞেস করলেন হে আল্লাহর রাসূল (সা:) গিবত কিভাবে যিনা বা ব্যভিচার থেকে গুরুতর অপরাধ হয়? রাসূল (সা:) বললেন, ব্যভিচার করার পর মানুষ আল্লাহর নিকট তওবা করলে আল্লাহপাক তা কবুল করেন। কিন্তু গিবতকারী ব্যক্তিকে যতক্ষণ পর্যন্ত সে ব্যক্তি (যার গিবত করা হয়েছে) ক্ষমা না করে, ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ পাক মাফ করবেন না।
গিবতের ক্ষতিসমূহের মধ্যে অন্যতম হলো যার গিবত করা হয় তার আমলনামায় গিবতকারীর সওয়াব চলে যায় এবং গিবতকারীর আমলনামায় যার গিবত করা হয় তার গুনাহ চলে আসে। এ জন্যই হযরত হাসান বসরী (রহ.) যখন শুনতে পেতেন তার সম্পর্কে কেউ গিবত করেছে, তখন তিনি সেই ব্যক্তির জন্য অনেক ফল ও বিভিন্ন মিষ্টান্ন দ্রব্য হাদিয়া হিসেবে পাঠিয়ে দিতেন এবং বলতেন, মাশাআল্লাহ তিনি আমার অনেক উপকার করেছেন।
গিবতের হুকুম –
গিবত করা কবীরা গোনাহ। এটি হারাম। তাই এটি শোনাও হারাম। কারণ যে কাজ করা হারাম। সে কাজ করতে সহযোগিতা করাও হারাম।
কারণ যে শুনছে, সে যদি না শুনতো, তাহলে গিবতকারী গিবত করতে পারে না। যদি যে শ্রোতা সে যদি বাঁধা দেয়, তাহলে গিবতকারী গিবত করতে পারে না। তাহলে শ্রোতা শোনার দ্বারা গিবতকারীকে গিবতের মত কবীরা গোনাহ করতে সহযোগিতা করছে। আর গোনাহের সহযোগিতা করাও নিষিদ্ধ। তাই উভয় কাজই নিষিদ্ধ ও হারাম।
وَلَا يَغْتَب بَّعْضُكُم بَعْضًا ۚ أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَن يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۚ إِنَّ اللَّهَ تَوَّابٌ رَّحِيمٌ [٤٩:١٢]
তোমাদের কেউ যেন কারও পশ্চাতে নিন্দা না করে। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভ্রাতার মাংস ভক্ষণ করা পছন্দ করবে? বস্তুতঃ তোমরা তো একে ঘৃণাই কর। আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ তওবা কবুলকারী,পরম দয়ালু। [সূরা হুজুরাত-১২]
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ ۖ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۖ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ [٥:٢]
সৎকর্ম ও খোদাভীতিতে একে অন্যের সাহায্য কর। পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে একে অন্যের সহায়তা করো না। আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলা কঠোর শাস্তিদাতা। [সূরা মায়িদা-২]
وَإِذَا رَأَيْتَ الَّذِينَ يَخُوضُونَ فِي آيَاتِنَا فَأَعْرِضْ عَنْهُمْ حَتَّىٰ يَخُوضُوا فِي حَدِيثٍ غَيْرِهِ ۚ وَإِمَّا يُنسِيَنَّكَ الشَّيْطَانُ فَلَا تَقْعُدْ بَعْدَ الذِّكْرَىٰ مَعَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ [٦:٦٨]
যখন আপনি তাদেরকে দেখেন, যারা আমার আয়াত সমূহে ছিদ্রান্বেষণ করে, তখন তাদের কাছ থেকে সরে যান যে পর্যন্ত তারা অন্য কথায় প্রবৃত্ত না হয়,যদি শয়তান আপনাকে ভূলিয়ে দেয় তবে স্মরণ হওয়ার পর জালেমদের সাথে উপবেশন করবেন না। [সূরা আল আনআম-৬৮]
গিবত করা হারাম ও কবিরা গোনাহ। আল্লাহ বলেন, ‘দুর্ভোগ প্রত্যেকের, যে সামনে এবং পিছনে পরনিন্দা করে। (সুরা হুমাযা : আয়াত ১)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘ব্যভিচার করার পর মানুষ আল্লাহর নিকট তাওবা করলে আল্লাহ তাআলা তাওবা কবুল করেন। কিন্তু গিবতকারী ব্যক্তিকে যে পর্যন্ত ওই ব্যক্তি (যার গিবত করা হয়েছে) ক্ষমা না করে; ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন না। (মিশকাত)
আল্লাহ বলেন,وَلَا تُطِعْ كُلَّ حَلَّافٍ مَهِيْنٍ، هَمَّازٍ مَشَّاءٍ بِنَمِيْمٍ- ‘ আর তুমি তার আনুগত্য করবে না যে অধিক শপথ করে, যে লাঞ্ছিত। যে পশ্চাতে নিন্দা করে ও একের কথা অপরের নিকট লাগিয়ে বেড়ায়’ (সূরা আল ক্বলম ৬৮/১০-১১)।
ঘ। গালমন্দের পরিচয় ও কুফল –
গালমন্দ বলতে কাওকে অশ্লীল কথা বলা, গালি দেওয়া, অমঙ্গল প্রত্যাশা , অভিশাপ দেওয়া ইত্যাদিকে বুঝায়।অশ্লীল কথা বলা বা কথাবার্তায় অশ্লীল ভাষা প্রয়োগ করা মুমিনের বৈশিষ্ট্য নয়। এগুলি সর্বতোভাবে পরিত্যাজ্য। গালি আমাদের সমাজের এক মারাত্মক ব্যাধি। গালি দেয়া পাপের কাজ। গালিগালাজ করা কোনো সুস্থ মানসিকতার পরিচয় নয়। মুদ্রাদোষ বা অভ্যাসবশত অনেকেই কথায় কথায় গালি দেন, অনেকেই হাসি-তামাশা ও ঠাট্টাচ্ছলেও অন্যকে গালি দিয়ে বসেন এসবের কোনোটিই ঠিক নয়।
ইবনে মাসউদ (রা:) হতে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (স.) বলেন,لَيْسَ الْمُؤْمِنُ بِالطَّعَّانِ وَلَا اللَّعَّانِ وَلَا الْفَاحِشِ وَلَا الْبَذِيءِ ‘ মুমিন কখনো দোষারোপকারী ও নিন্দাকারী হ’তে পারে না, অভিসম্পাতকারী হ’তে পারে না, অশ্লীল কাজ করে না এবং কটূভাষীও হয় না’। তিরমিযী হা/১৯৭৭; মিশকাত হা/৩৬; ছহীহাহ হা/৩২০;আহমাদ: ৩৮২৯।
* কুফল-
ইসলামের দৃষ্টিতে অন্যকে গালি দেওয়া সম্পূর্ণ হারাম। আর তা যদি হয় বিনা অপরাধে, তাহলে তা আরো জঘন্য অপরাধ। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, যারা বিনা অপরাধে ঈমানদার পুরুষ ও নারীদের কষ্ট দেয়, তারা অবশ্যই মিথ্যা অপবাদ ও স্পষ্ট অপরাধের বোঝা বহন করে। (সুরা আহজাব, আয়াত : ৫৮)
রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘মুসলিমকে গালি দেওয়া ফাসেকি [আল্লাহর অবাধ্য আচরণ] এবং তার সঙ্গে লড়াই ঝগড়া করা কুফরি’ (বুখারি, হাদিস : ৬০৪৫, ৭০৭৬; তিরমিজি, হাদিস : ১৯৮৩)।
অন্য এক হাদিসে আছে, ‘কবিরা গুনাহগুলোর একটি হলো নিজের বাবা-মা’কে অভিশাপ করা। ’ জিজ্ঞেস করা হল, আল্লাহর রাসুল! মানুষ নিজের বাবা-মা’কে কিভাবে অভিশাপ করে?’ তিনি বললেন, ‘যখন সে অন্যের বাবাকে গালি-গালাজ করে, তখন সে নিজের বাবাকেও গালি-গালাজ করে থাকে। আর সে অন্যের মা-কে গালি দেয়, বিনিময়ে সে তার মা-কেও গালি দেয়। ’ (বুখারি, হাদিস নং: ৫৯৭৩, তিরমিজি, হাদিস নং: ১৯০২)
আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি তার (কোনো মুসলিম) ভাইয়ের সম্মান নষ্ট করেছে অথবা কোনো বিষয়ে জুলুম করেছে, সে যেন আজই (দুনিয়াতে) তার কাছে (ক্ষমা চেয়ে) হালাল করে নেয়-ওইদিন আসার আগে, যেদিন দিনার ও দিরহাম কিছুই থাকবে না। তার যদি কোনো নেক আমল থাকে, তবে তার জুলুমের পরিমাণ অনুযায়ী তা থেকে নিয়ে নেওয়া হবে। আর যদি তার কোনো নেকি না থেকে, তবে তার সঙ্গীর পাপরাশি তার (জালেমের) ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে। ’ (বুখারি, হাদিস নং: ২৪৪৯, ৬৫৩৪; মুসনাদ আহমাদ, হাদিস নং: ৯৩৩২)
পার্থিব জীবনে বিভিন্ন প্রয়োজনে মানুষের সাথে কথাবার্তা বলতে হয়। মানুষের পক্ষে সমাজে মুখ বন্ধ করে বসবাস করা সম্ভব নয়। নিজের প্রয়োজন যেমন তাকে অন্যের কাছে ব্যক্ত করতে হয়, তেমনি অন্যের প্রয়োজনে তাকে এগিয়ে আসতে হয়। এক্ষেত্রে কথা বলার কোন বিকল্প নেই। কিন্তু কথা বলার ক্ষেত্রেও মুমিনকে কিছু আদব-কায়েদা বা শিষ্টাচার মেনে চলতে হয়। কেননা সে বিনা প্রয়োজনে যেমন কথা বলবে না, তেমনি প্রয়োজনের সময় কথা না বলে নিশ্চুপ থাকবে না। বরং ইসলামের নির্দেশ মেনে কথাবার্তা বলবে। কথাবার্তায় ইসলামী আদব বা শিষ্টাচার মেনে চলা জরুরি। এর মাধ্যমে ইহকালে মানুষের ভালাবাসা ও শ্রদ্ধা লাভ করা যাবে এবং পরকালীন জীবনে অশেষ ছওয়াব হাছিল করা যাবে।
0 Comments