সামাজিক সু-সম্পর্ক স্থাপনে সালামের গুরুত্ব : একটি পর্যালোচনা
ইসলামে সালামের প্রচলন একটি যুগান্তকারী ও সার্বজনীন বিষয়।ইসলামি ভ্রাতৃত্ববোধে সালামের সংস্কৃতি প্রথম প্রচলিত হয় হযরত আদম আলাইহিস সালাম থেকে। পরবর্তী পর্যায়ে হযরত রাসুলুল্লাহ (সাঃ) সকলকে সালাম প্রদান করার নির্দেশ দেন।সার্বজনীন পরিপূর্ণ জীবন বিধান ইসলাম মানবতার শান্তির জন্য পারষ্পরিক সালামের প্রতি যথেষ্ট গুরুত্বারোপ করেছে।
ক. সালামের পরিচিতি
সালামের শাব্দিক, পারিভাষিক সংজ্ঞা ও সালামের শব্দাবলী অর্থসহ ব্যাখ্যা :
সালাম (আরবি : ٱلسَّلَامُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ ٱللَّٰهِ وَبَرَكَاتُهُ)একটি আরবি শব্দ। এর অর্থ হচ্ছে শান্তি, প্রশান্তি কল্যাণ, দোয়া, আরাম, আনন্দ, তৃপ্তি। সালাম একটি সম্মানজনক, অভ্যর্থনামূলক, অভিনন্দনজ্ঞাপক, শান্তিময় উচ্চমর্যাদা সম্পন্ন পরিপূর্ণ ইসলামী অভিবাদন।শরীয়তের পরিভাষায় সালাম হচ্ছে,মুসলমানদের পারষ্পরিক সাক্ষাতের সময় ‘আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ’ বলে অভিবাদন জানানো,কল্যাণ কামনা,নিরাপত্তা দান ও কুশল বিনিময় করা।এখানে আসসালামু আলাইকুম (السلام عليكم) এর অর্থ “আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক’’ যা মুল ইসলামী অভিবাদন। এর সাথে আরো যুক্ত করা হয় ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারকাতুহ যার অর্থ “আল্লাহর রহমত ও বরকত”।
খ. সালামের বিধান
কুরআন ও হাদীসের আলোকে সালামের বিধান :
সালাম বা অভিবাদন ইসলামি শরিয়তের একটি মৌলিক বিষয়,যা সমাজের মানুষকে আদব বা শিষ্ঠাচার শিক্ষা দেয়।সালাম ইসলামের অন্যতম শি,য়ার।কুরআন এবং হাদিসে সালামের গুরুত্ব সম্পর্কে ব্যাপক আলোচনা আমরা লক্ষ্য করি।কুরআনের ভাষায়,
وَإِذَا حُيِّيْتُم بِتَحِيَّةٍ فَحَيُّواْ بِأَحْسَنَ مِنْهَا أَوْ رُدُّوهَا إِنَّ اللّهَ كَانَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ حَسِيبًا
‘যখন তোমাদেরকে অভিবাদন করা হয়, তোমরাও অভিবাদন জানাও তারচেয়ে উত্তমভাবে অথবা তারই মতো করে ফিরিয়ে দাও। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্ব বিষয়ে হিসাব-নিকাশ গ্রহণকারী।’ (সূরা: নিসা, আয়াত: ৮৬)
সালাম দেয়া ও তার জবাব দেয়ার বিধান-
১. স্বাভাবিক অবস্থায় এক মুসলমান অপর মুসলমানের সাক্ষাতে সালাম দেয়া সুন্নাত,এতে ওলামায়ে কেরামের ইজমা হয়েছে । কেননা সালাম ইসলামি সংস্কৃতির অন্যতম নিদর্শন।
২.মুসলিম ও অমুসলিম একত্রে থাকলে ‘আসসালামু আল মানিত্তাবাআল হুদা’ বলবে। আর অমুসলিমরা সালাম দিলে তদুত্তরে শুধু ‘ওয়া আলাইকুম’ বলবে।
৩.নামায,কুরআন তেলওয়াত,পানাহার,মলমূত্র ত্যাগ, যিকির ইত্যাদিতে মশগুল ব্যক্তিকে সালাম দেয়া মাকরুহ।
৪. জমহুর ওলামায়ে কেরামের মতে,সালামের জবাব দেয়া ওয়াজিব।কতিপয় আলেমের মতে,সালামের জবাব দেয়া সালাম দেয়ার ন্যায় সুন্নাত।
৫. আল্লামা ইবমে মালেক(র) বলেন,মহিলাদের সালাম দেয়া মহানবী (সাঃ)এর জন্য বিশেষিত ;অন্য কারো জন্য নয়।আর যদি মহিলা অতি বৃদ্ধ হয় এবং ফেতনার আশঙ্কা না থাকে,তবে ঐ শ্রেণীর মহিলাকে সালাম প্রদান করা জায়েজ। কেননা সাহাবীগণের যুগে এধরনের অনেক ঘটনা আছে যে,তাঁরা পর্দার অন্তরালে মহিলাদের সালাম দিয়েছেন।
গ. সালামের ফযিলত
ইসলাম পরিপূর্ণ জীবন বিধান ,এখানে সালামের যথেষ্ট ফযিলত রয়েছে। তাই মানব সৃষ্টির সূচনা থেকেই মহান আল্লাহ্তায়ালা একে অপরের প্রতি সম্ভাষণ করার পদ্ধতি নবী-রাসুলদের মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছেন। সর্বপ্রথম তিনি হজরত আদমকে (আ.) সালামের শিক্ষা দেন। হজরত আদমকে (আ.) সৃষ্টি করার পর আল্লাহ্তায়ালা তাকে ফেরেশতাদের সালাম দেওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি সালাম দিলে ফেরেশতারাও সালামের উত্তর দেন।
হাদিসের ৪ টি উদ্ধৃতি সহ সালামের ফযিলত সংক্ষেপে বর্ণনা –
১.হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন,তোমরা বেহেশতে প্রবেশ করবে না যতক্ষণ পর্যন্ত ঈমানদার না হবে, তোমরা ঈমানদার হতে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না পরস্পরের মধ্যে ভালোবাসা ও সৌহার্দ স্থাপন করবে। আমি কী তোমাদের এমন বিষয়ের কথা বলব না, যা করলে তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠিত হবে? সাহাবিরা বললেন, নিশ্চয় ইয়া রাসূলাল্লাহ! (তিনি বললেন) ‘তোমাদের মধ্যে বহুল পরিমাণে সালামের প্রচলন করো।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর: ৮১)
২. ইমরান বিন হুসাইন বর্ণনা করেন, ‘এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহর (সা.) কাছে এসে বললো আসসালামু ‘আলাইকুম। তিনি (সা.) বললেন, ‘দশ।’ আরেক ব্যক্তি এসে বললো আসসালামু ‘আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ। তিনি (সা.) বললেন, ‘বিশ।’ আরেক ব্যক্তি এসে বললো আসসালামু ‘আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু। তিনি বললেন, ‘ত্রিশ।’ (জামে তিরমিযী)
৩ . হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর(রাঃ) হতে বর্ণিত, জনৈক ব্যক্তি হযরত রাসূলুল্লাহ (সাঃ)কে জিজ্ঞেস করলেন,"হে আল্লাহর রাসুল!ইসলামের মধ্যে কোন কাজটি সর্বোত্তম? " তিনি বললেন,"তুমি অপরকে খাদ্য দেবে এবং পরিচিত অপরিচিত সবাইকে সালাম দেবে(মুসলিম ও বুখারি)
৪. হযরত আনাস( রাঃ) হতে বর্ণিত, হযরত রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করেছেন,হে বৎস! যখন তুমি তোমার বাড়িতে প্রবেশ করবে,তখন সালাম করবে।কেননা,তোমারও তোমার পরিবারের লোকদের জন্য বরকতের কারণ হবে।(তিরমিজি)
ঘ. সামাজিক গুরুত্ব
সালামের গুরুত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে রাসুলে করিম (সা.) বলেন, যখন দু'জন মুসলমানের মধ্যে সাক্ষাৎ হয় এবং তারা সালাম-মুসাফাহা করে, তখন একে অপর থেকে পৃথক হওয়ার আগেই তাদের সব গোনা ক্ষমা করে দেওয়া হয়।
সালামের ৫ টি সামাজিক গুরুত্ব নিচে সংক্ষেপে দেয়া হল –
১. ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত হয়ঃ সালামের মাধ্যমে সামাজিক ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত হয়।সালাম ইসলামি শরীয়তে প্রচলিত একটি দোয়া,যা মুসলমানদের পারষ্পরিক সাক্ষাতে বিনিময় হয়।আর এই সালাম বিনিময়ের মাধ্যমেই একে অপরের সাথে গভীর এক ভ্রাতৃত্ববোধে আবদ্ধ হয়।
২. পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় হয়ঃ নিজের ঘরে প্রবেশের সময় সালাম দেয়া, স্ত্রী-সন্তান-সন্তুতির সামনে সালাম বিনিময় করাসহ কারও বাড়িতে প্রবেশের সময় সালাম দেয়া এবং ঘরে প্রবেশের অনুমতি নেয়া সবচেয়ে উত্তম কাজ।এতে করে পারিবারিক বন্ধন আরো দৃঢ় হয়।
৩.শান্তি প্রতিষ্ঠাঃ মানব সৃষ্টির পর থেকে যত নবি-রাসুল এসেছেন সবাই পৃথিবীতে শান্তি-প্রতিষ্ঠার জন্যই কাজ করেছেন। একমাত্র ইসলাম ধর্মেই এই অনিন্দ্য বার্তাটি রয়েছে। ইসলাম ধর্মের ন্যায় অন্যান্য ধর্মেও একে অপরকে সম্মান জানানোর নিয়ম রয়েছে কিন্তু তা দুনিয়াতে নিয়ম পালনার্থে করা হয়।
৪.পারষ্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ দূর হয়ঃ সালাম হচ্ছে বান্দার জন্য নিয়ামত। সালামের প্রচলন সমাজ থেকে হিংসা-বিদ্বেষ দূর করে সমাজকে স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করে। সমাজের স্থিতিশীলতা সার্বিকভাবে সমাজের উন্নয়ন ঘটায় এবং সকল প্রকার উশৃঙ্খলার অবসান ঘটায়।
৫. সার্বিক কল্যাণে ক্ষেত্রেঃ সালাম ইসলামি আচরণের অন্যতম নিদর্শন। ইসলাম সর্বাপেক্ষা সুন্দর এবং গ্রহণযোগ্য ধর্ম।ইসলামের সকল নিয়ম কানুন হচ্ছে সর্বোত্তম আদর্শ। সালাম হচ্ছে ইসলামি সৌন্দর্যের এক ক্ষুদ্র বহিঃপ্রকাশ। পরিবার,সমাজ,রাষ্ট্র সকল স্তরের সার্বিক কল্যাণের জন্য ইসলামি আচার-আচরণ তথা সালাম এক গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক।আসসালামু আলাইকুম মানে আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। সালামের মাধ্যমে পরস্পরের জন্য শান্তি ও কল্যাণ কামনা করা হয়
সালাম দেয়া ও জবাব দেয়ার গুণ যখন একজন মানুষের অন্তরে জাগ্রত হয়, তখন মানবমনের ভেতর লুকিয়ে থাকা অহঙ্কার, বড়ত্ব ভাব, হিংসা-বিদ্বেষ, অন্যের প্রতি মন্দ ধারণা পোষণ ইত্যাদি অনৈসলামিক ও দূষণীয় চিন্তাধারা দূরীভূত হয় এবং তার ইমান মজবুত হয়, অন্তর নরম হয়। ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ বৃদ্ধি পায়। মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধ সুদৃঢ় হয়। রাসুলের সুন্নত প্রতিষ্ঠিত হয়। আল্লাহ্ সেই বান্দার প্রতিও সদয় হন। ফলে তার প্রতি মহানা আল্লাহ্তায়ালার রহমত ও বরকত বর্ষিত হয়। ইহকালীন জীবনকে সুন্দর ও সুশৃঙ্খলভাবে তথা শান্তিপূর্ণভাবে পরিচালিত করার নিমিত্তে মহানবী হজরত মুহাম্মদের (সা.) বিশেষ সুন্নাহ সালামের ব্যাপক প্রচলনের কোনো বিকল্প নেই। সালামের ব্যাপক প্রচলন করার জন্য রাসুলে করিম (সা.) যেভাবে সালাম দেওয়ার বিধান আমাদের জন্য রেখে গেছেন, তা অনুসরণ ও অনুকরণ করা অতীব জরুরি।

0 Comments